নয়াদিল্লি: মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধের সমান। শিশুর শারীরিক পুষ্টির জন্য যেমন মায়ের দুধ অপরিহার্য, তেমনই তার মানসিক ও বৌদ্ধিক বিকাশের জন্য মাতৃভাষার কোনও বিকল্প নেই। আমাদের দেশে মাতৃভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার দাবি বহুদিনের। বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু একবার ক্ষোভের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘যাঁরা বলেন যে, বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা সম্ভব নয়, তাঁরা হয় বাংলা জানেন না, নয়তো বিজ্ঞান জানেন না।’ বাংলা তথা আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে আচার্য বিজ্ঞানীর তেজস্বী কণ্ঠস্বরই যেন এবার একুশ শতকের প্রেক্ষাপটে প্রতিধ্বনিত হল ইউনেস্কোর গলায়।
রাষ্ট্রসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো তাদের সাম্প্রতিক ‘ইন্ডিয়া এডুকেশন রিপোর্ট’-এ ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় এক আমূল পরিবর্তনের সুপারিশ করেছে। ১৬৫ পৃষ্ঠার রিপোর্টে বহুভাষিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে শিক্ষানীতিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য ১০টি নির্দিষ্ট প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
সংস্থার স্পষ্ট অভিমত, ভারতের সমস্ত স্কুলব্যবস্থায় শিক্ষার প্রধান মাধ্যম হিসাবে মাতৃভাষাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। ইউনেস্কোর দাবি, একটি শিশু যখন নিজের চেনা পরিমণ্ডলে নিজের মাতৃভাষায় পাঠ গ্রহণ করে, তখন তার বোঝার ক্ষমতা, মৌলিক চিন্তাশক্তি এবং সৃজনশীলতা দ্রুত বিকশিত হয়।
প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, ইংরেজি বা অন্য কোনও অপরিচিত ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে অনেক সময়েই শিক্ষার্থীরা পাঠ্যক্রমের খেই হারিয়ে ফেলে। এর ফলে তাদের মধ্যে এক ধরনের হীনম্মন্যতা তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে স্কুলছুটের হার বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে বিজ্ঞান ও গণিতের মতো জটিল বিষয়গুলি যদি সহজ মাতৃভাষায় ব্যাখ্যা করা যায়, তবে শিক্ষার্থীর মধ্যে সেই বিষয়ের প্রতি ভীতি দূর হয় এবং কৌতূহল বৃদ্ধি পায়। ভারতের মতো বহুজাতিক, বহুভাষিক ও বৈচিত্র্যময় দেশে মাতৃভাষা কেবল একটি যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি তার হাজার বছরের সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। ইউনেস্কো মনে করে, আঞ্চলিক ভাষাকে শিক্ষার মূল ভিত্তি হিসাবে ব্যবহার করলে গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের শিশুদের শিক্ষার মূল স্রোতে রাখা অনেক সহজ হবে।
ইউনেস্কো (UNESCO) মনে করিয়ে দিয়েছে, মাতৃভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার অন্যতম চাবিকাঠি। ভারতের জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-তে ইতিমধ্যে মাতৃভাষায় গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ইউনেস্কোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন সেই উদ্যোগকে আরও আন্তর্জাতিক মান্যতা দিল। শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে বিদেশি ভাষা শেখার প্রয়োজন থাকলেও মেধার ভিত তৈরি হওয়া উচিত মাতৃভাষাতেই। আন্তর্জাতিক সংস্থার এহেন আহ্বান মেনে ভারত তার আগামীর শিক্ষা মানচিত্র কীভাবে সাজায়, এখন সেটাই দেখার।
