প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমান: প্রাচীন লোকসংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে জায়গা করে নিতে চলেছে পূর্ব বর্ধমানের (Purba Bardhaman) পূর্বস্থলীর ‘নতুনগ্রাম’ (Natungram picket doll craft)। হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী বঙ্গীয় ঘরানার কাঠপুতুল সম্প্রতি জিআই (Geographical Indication) তকমা পাওয়ায় এই শিল্পের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হয়েছে। এবার এই দারুশিল্পকে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দিতে বিশেষ তৎপর হয়েছে ইউনেস্কো। বুধবার ইউনেস্কোর একটি প্রতিনিধি দল নতুনগ্রামে পৌঁছে স্থানীয় বিধায়ক গোপাল চট্টোপাধ্যায় এবং প্রশাসনের আধিকারিকদের সঙ্গে নিয়ে শিল্পীদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
নতুনগ্রামের কাঠপুতুল শিল্পের গঠনশৈলী এবং রঙের ব্যবহার অত্যন্ত স্বতন্ত্র। শিল্পীদের তৈরি কাঠের পেঁচা, গৌড়-নিতাই এবং বর-বৌয়ের পুতুলের চাহিদা রাজ্য ছাড়িয়ে সারা দেশে রয়েছে। অনেকের মতে, এই পুতুল তৈরির শৈলীর সঙ্গে বৈষ্ণবীয় ধারার নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। মিশরের মমির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ এই দারুশিল্প কেবল একটি পণ্য নয়, বরং বাংলার লোকসংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। গামার, শিমূল, পিটুলি ও সোনাঝুরি কাঠের ওপর খোদাই করা এই শিল্পকর্ম দেশ-বিদেশের বাজারে পৌঁছে দিতেই এবার উদ্যোগী হয়েছে ইউনেস্কো।
বৈঠকে ইউনেস্কোর প্রতিনিধিরা শিল্পীদের গুণমান উন্নয়ন, বিদেশে বিপণন এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ক্রিয়েটিভ বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের রাজর্ষি দাস জানিয়েছেন, শিল্পীদের তৈরি শিল্পকর্ম সরাসরি বিক্রির জন্য কলকাতায় ‘সোনাঝুরি হাট’-এর মতো স্থায়ী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে এই শিল্পকে ছড়িয়ে দিতে অনলাইনে বিক্রির ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। নতুনগ্রামের প্রায় ১৫০ জন শিল্পী এখন এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। তাঁরা পুতুলের পাশাপাশি কাঠের খাট, টেবিল, চেয়ার এবং গয়না তৈরিতেও বিশেষ পারদর্শী।
জিআই স্বীকৃতি মেলায় এই প্রাচীন শিল্পের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত হয়েছে। স্থানীয় শিল্পী গৌরাঙ্গ ভাস্কর ও ঘোতন সূত্রধরদের মতে, এই তকমা পাওয়ার ফলে শিল্পীরা তাঁদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাবেন। তবে তাঁদের দাবি, নতুনগ্রামকে পর্যটন মানচিত্রে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার জন্য গ্রামে একটি তোরণ নির্মাণ এবং প্রশাসনিক স্বীকৃতির প্রয়োজন। বিধায়ক গোপাল চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ,’নতুনগ্রামের শিল্পীদের শিল্পকর্মের প্রচার বাড়ানো ও বিপণনের জন্য জিআই স্বীকৃতি অনেকটাই সহায়ক হবে।’ শিল্প ইতিহাসবিদদের মতে, ইউনেস্কোর এই হস্তক্ষেপে নতুনগ্রাম আগামীদিনে কেবল একটি গ্রাম নয়, বরং একটি বিশ্বমানের সাংস্কৃতিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে চলেছে।

