উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: সংসার সামলানো মানেই কি কেবল ঘরের কাজ? প্রচলিত এই ধারণাকে কার্যত ধূলিসাৎ করে দিল ভারতের শীর্ষ আদালত (Supreme Courtroom)। বুধবার এক যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল, গৃহিণীদের শুধুমাত্র ‘হোমমেকার’ (Homemakers) বলে অভিহিত করা তাঁদের অবদানের প্রতি চরম অবজ্ঞা। বিচারপতি সঞ্জয় করোলের বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, একজন গৃহিণী শুধু পরিবারের ভিত মজবুত করেন না, বরং পরবর্তী প্রজন্মকে গড়ে তুলে পরোক্ষভাবে দেশ গঠনে (Nation Builders) অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
২০০১ সালের এক দুর্ঘটনায় পঞ্জাবের এক মহিলার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দায়ের করা মামলায় এই যুগান্তকারী রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। মোটর অ্যাকসিডেন্ট ক্লেম ট্রাইবুনাল ও হাই কোর্টের রায়কে সংশোধন করে শীর্ষ আদালত নির্দেশ দিয়েছে, বিমা সংস্থাকে ওই মহিলার পরিবারকে ৬২.৭৮ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আদালত স্পষ্ট করেছে, সংসারের কাজে গৃহিণীদের যে নিরবচ্ছিন্ন শ্রম, তার অর্থনৈতিক মূল্য অপরিসীম। একজন গৃহিণীর সেবাপ্রদান ও সাংসারিক কাজের ন্যূনতম মাসিক মূল্য ৩০ হাজার টাকা বলেও উল্লেখ করেছে আদালত।
আদালতের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণসমূহ:
• বিয়ে মানে পরিচারিকা নয়: আদালত সাফ জানিয়েছে, বিবাহিত হওয়া মানেই নারীর পেশাগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দেওয়া নয়। সন্তানের দেখাশোনা বা সংসারের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি কোনো মহিলা যদি ক্যারিয়ারে সফল হতে চান, তবে তাকে কোনোভাবেই শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের প্রতি ‘নির্মমতা’ বলে গণ্য করা যাবে না।
• অর্থনৈতিক মূল্যায়নের দাবি: দীর্ঘ সময় ধরে বিনা পারিশ্রমিকে সংসারের সেবার কারণে পারিবারিক সম্পত্তিতে নারীর আইনি অধিকার রয়েছে।
বিচারপতি সঞ্জয় করোলের বেঞ্চের মন্তব্য, ‘‘আমরা ভুল করে তাদের গৃহিণী বা হোমমেকার বলি। প্রকৃতপক্ষে তাঁরাই দেশের নির্মাতা (Nation Builders)।’’ আদালত দেশের সব হাই কোর্টকে নির্দেশ দিয়েছে, দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর মামলায় যাতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দ্রুত ন্যায়বিচার ও প্রাপ্য আর্থিক সাহায্য পায়, তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা পিতৃতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণায় পরিবর্তন এনে সুপ্রিম কোর্টের এই রায় ভারতীয় গৃহিণীদের দীর্ঘদিনের অদৃশ্য লড়াই ও ত্যাগের এক আইনি স্বীকৃতি দিল বলেই মনে করছেন সমাজতাত্ত্বিকরা। তাঁদের মতে, এটি কেবল একটি আর্থিক মামলার রায় নয় বরং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলের এক কঠিন বার্তাও বটে।
