উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রথম উপনির্বাচন রক্তপাতহীনভাবে সম্পন্ন হলেও, পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম এবং মুর্শিদাবাদের রেজিনগর কেন্দ্র দুটির মঙ্গলবারের ভোটগ্রহণ (Nandigram and Rejinagar by-election) পর্ব ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক কোলাহল। নির্বাচন প্রক্রিয়া পুরোপুরি অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়েছে কি না, তা নিয়ে জোরদার সওয়াল-জওয়াব চালাচ্ছে বিরোধী শিবির। কেন্দ্রীয় বাহিনী ও উর্দিধারীদের নাকের ডগায় বুথ দখল, ছাপ্পা ভোট, বিরোধী দলের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া এবং মহিলা ভোটারদের গণতান্ত্রিক অধিকারে বাধা দেওয়ার মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলেছে তৃণমূলের দুটি পৃথক শিবির, কংগ্রেস এবং বামেরা। এই পরিস্থিতিতে দুই কেন্দ্রেই ভোট বাতিলের জোরালো দাবি তুলেছে প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্ব। অন্যদিকে, সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে শাসকদল বিজেপির দাবি, নির্বাচন সম্পূর্ণ নির্বিঘ্ন ও শান্তিতেই মিটেছে।
মঙ্গলবারের এই নির্বাচন পর্ব মিটতেই জয়ের ব্যাপারে চরম আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (CM Suvendu Adhikari)। তাঁর দাবি, নন্দীগ্রামে রেকর্ড ব্যবধানে জয়ের পাশাপাশি রেজিনগর আসনেও অন্তত তিরিশ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নেবে বিজেপি (BJP)। শুভেন্দু বলেন, ‘বিজেপি যত দিন ক্ষমতায় থাকবে, বড় কোনও অশান্তি আমরা ঘটাতে দেবো না। ছোটখাটো ইনসিডেন্ট ঘটতেই পারে, তর্কবিতর্ক, ধাক্কাধাক্কি হতে পারে। কিন্তু খুন, বোমাবাজি— ভোটের যে ছবি অতীতে দেখা গিয়েছে, তা হয়নি।’ তাঁর আরও পর্যবেক্ষণ যে, মমতা-তৃণমূল এবং কংগ্রেসের মতো বিরোধী দলগুলির সাংগঠনিক লোকবল বা বুথ এজেন্ট পর্যন্ত মাঠে উপস্থিত ছিল না, আর সেই শূন্যতা ঢাকতেই এখন কাল্পনিক অভিযোগ তুলছে তারা। নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যানে প্রকাশ, বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত নন্দীগ্রামে ভোটদানের হার ছিল ৭৯.৩৯ শতাংশ এবং রেজিনগরে ৭৮.৪২ শতাংশ। গত ২৩ এপ্রিল বিধানসভা ভোটের তুলনার এই হার কিছুটা কম হলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে সাড়ে পাঁচ মাসের ব্যবধানে এই পরিসংখ্যান যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
মুখ্যমন্ত্রী এদিন আরও জানান যে, রেজিনগরের সংখ্যালঘু মহিলা ও যুবসমাজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে, যদিও প্রবীণ সংখ্যালঘু অংশের একটা ভোট গিয়েছে কংগ্রেস ও আম জনতা উন্নয়ন পার্টির বাক্সে। তাঁর মতে, এই নির্বাচনে তৃণমূল ও বামেদের অস্তিত্ব কার্যত বিপন্ন। অন্নপূর্ণা যোজনা এবং আবাস যোজনার সুবিধাভোগী সংখ্যালঘু মহিলারা বিজেপি প্রার্থীর পক্ষেই আস্থা রেখেছেন বলে তাঁর জোরালো মত। একই সঙ্গে তিনি কটাক্ষ করে বলেন যে, নন্দীগ্রাম বা রেজিনগরে বাম কিংবা তৃণমূল প্রার্থীরা নোটার থেকেও কম ভোট পেতে পারেন। বিরোধীদের রিগিংয়ের সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি।
ভোটের দিন রেজিনগরে চরম নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়, যখন দলীয় কার্যালয় থেকে নির্বাচনী বিধিভঙ্গের অভিযোগে আমজনতা উন্নয়ন পার্টির বিধায়ক হুমায়ুন কবীরকে আটক করে পুলিশ। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে তাঁর তীব্র বচসা ও টানাপড়েন বাধে। হুমায়ুনকে প্রকাশ্যে বলতে শোনা যায়, ‘রেজিনগরের ওসি সকাল থেকে আমাদের লোকদের বুথ ঢুকতে দিচ্ছে না। ভোট লুট করছে। বিজেপির দালালি করছে। মানুষকে বলব, এদের বিরুদ্ধে মুগুর নিয়ে দাঁড়াতে।’ এই মন্তব্যের পরেই পুলিশ তাঁকে পাকড়াও করে।
এই প্রসঙ্গে নন্দীগ্রামে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘নিজের বুথের এলাকার বাইরে গেলে পুলিশ আমাকেও ধরতে পারে। নিজের বুথের বাইরে গিয়ে যদি ভোটে প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করি, নির্বাচন কমিশন কী করবে? যদিও হুমায়ুনের বিরুদ্ধে পুলিশের এই পদক্ষেপকে নিছক ‘নাটক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী। সব মিলিয়ে ভোটের ফলাফল কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায় রাজনৈতিক মহল।

