মাথাভাঙ্গা: একসময় মাথাভাঙ্গায় কাঠের তৈরি দোতলা বাড়ি দেখা যেত। টিনের ছাদ, নানারকম কারুকার্য করা সুদৃশ্য বারান্দা, জানলা আর লোহার রেলিং দিয়ে তৈরি একেকটা ঘর শুধুমাত্র বসবাসের জায়গাই ছিল না, ছিল শিল্পকর্ম ও শহরের ঐতিহ্যের প্রতীক। সেসব কাঠের বাড়ি, মাথাভাঙ্গা শহরের আভিজাত্য এবং সামাজিক মর্যাদা বহন করত।
তবে এখন সময় বদলেছে। নগরায়ণের ছোঁয়ায় পালটেছে শহরের চেহারা। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বসতি। সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে পারিবারিক কাঠামোয়। সময়ের নিয়মে যৌথ পরিবার ভেঙে অণু পরিবারের দিকে এগিয়েছে। সেই পথে হেঁটেছেন মাথাভাঙ্গার বাসিন্দারাও। এই পরিবর্তনের ঢেউ এসে লেগেছে ঐতিহ্যবাহী কাঠের দোতলা বাড়িগুলির গায়েও। পূর্বপুরুষদের তৈরি এই কাঠামোগুলি জড়িয়ে গিয়েছে সম্পত্তির শরিকি ঝামেলার ফাঁসে। মালিকানার জটিলতার কারণে আজ সেগুলি কার্যত অবহেলার পাত্রে পর্যবসিত। বেশ কয়েকটি কাঠের বাড়ি ভেঙে ইতিমধ্যে বিল্ডিং তৈরি হয়েছে। সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে শহরের ইতিহাস।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরে এখনও যে কাঠের বাড়িগুলি রয়েছে, শরিকি ঝামেলার কারণে অধিকাংশেরই রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না। কেউ সংস্কারে আগ্রহী হলে, অন্য পক্ষ বাধা দিচ্ছে। ফলে কাঠের ক্ষয় হচ্ছে, ছাদ চুইয়ে জল পড়ছে। দুর্বল হচ্ছে বাড়ির কাঠামো। সংস্কারের অভাবে কিছু কিছু বাড়ি ইতিমধ্যেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। যেগুলি এখনও দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলিও যে কতদিন থাকবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
প্রতিটি কাঠের বাড়ি ইতিহাস বহন করছে। মাথাভাঙ্গা বাজারের ১০০ বছরের পুরোনো কাঠের দোতলা বাড়িটি এলাকার অন্যতম ল্যান্ডমার্ক হিসেবে পরিচিত। রাজস্থানের চুরু জেলা থেকে এসেছিলেন ব্যবসায়ী প্রয়াত বক্তারমল সেরাওগী। নিজ উদ্যোগে বাড়িটি নির্মাণ করেন তিনি। বর্তমানে বাড়িটির দায়িত্বে রয়েছেন তাঁর বংশধরদের মধ্যে অন্যতম নাতি সঞ্জয় সেরাওগী ও পুত্রবধূ পুষ্পাদেবী জৈন। পূর্বপুরুষের স্মৃতি রক্ষার্থে তাঁরা বাড়িটি এখনও অক্ষত রেখেছেন। নীচতলায় দোকান ভাড়া দিয়েছেন। তবে, ওপরের তলাটি ফাঁকা পড়ে রয়েছে। এভাবেই, সময়ের সাক্ষ্য বহন করছে বাড়িটি।
শহরের কালোয়ার পট্টিতে অবস্থিত আরেকটি শতবর্ষ প্রাচীন কাঠের দোতলা বাড়ি। সেখানে এখনও বসবাস করেন হংসরাজ তাপুরিয়া ও তাঁর পরিবার। শাল কাঠের তৈরি এই বাড়িটি এখনও শক্তপোক্ত অবস্থায় টিকে রয়েছে। হংসরাজের কথায়, ‘গ্রীষ্ম ও শীতকালে কাঠের বাড়ি প্রাকৃতিকভাবে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যার ফলে উভয় ঋতুতেই আরামদায়ক পরিবেশ সৃষ্টি হয়।’
পূর্বপাড়ার ২ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত শতবর্ষ প্রাচীন কাঠের দোতলা বাড়িটির মালিকানা বর্তমানে সাহা পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের হাতে। রাখালচন্দ্র সাহা, মাধবচন্দ্র সাহা এবং বিজয়চন্দ্র সাহা মিলে এই বাড়িটি তৈরি করেছিলেন। তবে অংশীদারদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় কেউই সংস্কারের উদ্যোগ নিচ্ছেন না।
শহরের বাসিন্দা জয়ন্ত গুহঠাকুরতা বললেন, ‘কাঠের বাড়িগুলোর বিলুপ্তি শুধুমাত্র স্থাপত্যের ক্ষতিই নয়, এটি ইতিহাস এবং সংস্কৃতিরও ক্ষতি। ঐতিহ্য রক্ষা এবং শহরের ইতিহাসকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হলে এখনই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’ ইতিহাসের শিক্ষক ডঃ রাজর্ষি বিশ্বাস বলেন, ‘কাঠের বাড়িগুলিকে হেরিটেজ সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করে সেগুলির সংরক্ষণের জন্য সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’
