মাথাভাঙ্গা: মাথাভাঙ্গা শহরে গেরুয়া রাজনীতির জন্মমুহূর্তের সাক্ষী তিনি। এমনকি, তঁার ও তঁার দাদা সতীশ বর্মনের উদ্যোগেই কোচবিহার জেলা সদর দপ্তরের জমি কেনা হয়। সেকথা আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন দলীয় কর্মীরা। তবে আদর্শ থেকে ক্ষমতা, ক্ষমতা থেকে হতাশা। শেষে সবার অলক্ষে মঞ্চ ছেড়ে নীরবে সরে আসেন যতীন্দ্র বর্মন। দলের সবার ‘যতীনদা।’
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে থেকেই নিজেকে সরিয়ে নিতে শুরু করেছিলেন। দলের অনুরোধে মাথাভাঙ্গা ও শীতলকুচিতে প্রচারে নামলেও ভোটের পর থেকে আর সক্রিয় নন যতীন। এখন দলের কোনও পদে নেই। যতীন্দ্রর কথায় অভিমান স্পষ্ট। তবে তিক্ততা নেই। তিনি বলেন, ‘আমাদের সময় মাথাভাঙ্গায় গ্রুপবাজি ছিল না। এখন ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াইয়ে কোথাও যেন হারিয়ে গিয়েছে আদর্শ।’ এরপরই তঁার সংযোজন, ‘যতদিন রাজনীতি করেছি, নিজের ব্যবসার টাকায় রাজনীতি করেছি। রাজনীতি থেকে রোজগার করার প্রয়োজন হয়নি। তখন রাজনীতি ছিল বিশ্বাসের লড়াই। ব্যক্তিস্বার্থের নয়।’
অকৃতদার যতীন্দ্র রাজনীতি ছেড়েছেন। তবে রাজনীতি পিছু ছাড়েনি প্রবীণ এই মানুষটার। বিকেলের আলো পড়তেই শহর লাগোয়া ভবেরহাট বাজারে বসে এখন তিনি ভাইপোর চায়ের দোকান সামলান। আর সেখানেই চায়ের কাপে ঝড় তোলে রাজনীতি। বিতর্কে বা বক্তৃতায় নয়। ক্রেতা-বিক্রেতা আলাপচারিতায় উঠে আসে মতবিনিময়। বাম, বিজেপি, তৃণমূল- সব দলের সমর্থকরা এসে গল্প করেন। তখন তঁার চায়ের দোকান যেন হয়ে ওঠে এক অঘোষিত ‘রাজনৈতিক ক্যাফে’।
আসলে রাজনীতি প্রবীণ এই মানুষটির মজ্জাগত। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস-এর শাখায় দাঁড়িয়ে দেশভক্তির শপথ নিয়েছিলেন। সেখান থেকেই পথ চলা শুরু। এরপর সক্রিয় কর্মী হিসেবে ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দেন। জরুরি অবস্থার সময় বাড়িতে পুলিশের হানা, গা-ঢাকা দিয়ে থাকার অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক চেতনার ভিত মজবুত করেছিল। কোচবিহার জেলা সাধারণ সম্পাদক, সহ সভাপতি- পদ বদলেছে বহুবার। দায়িত্ব বেড়েছে। বেড়েছে প্রভাবও। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে সাংগঠনিক কাজ করতে গিয়ে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে তপন শিকদার, রাহুল সিনহার মতো বর্ষীয়ান নেতাদের সঙ্গে। চা বাগান এলাকায় সংগঠন গড়ার কাজে কাটিয়েছেন রাতের পর রাত। তাই মাটির কাছের এই মানুষটা আজও হাসিমুখে বলতে পারেন, ‘দল বদলেছে। মানুষ বদলেছে। কিন্তু, সম্পর্কগুলো যেন না বদলায়।’
জেলা বিজেপির সাধারণ সম্পাদক মনোজ ঘোষ বলেন, ‘ব্যবসার ব্যস্ততার কারণে যতীন্দ্র এখন আর রাজনীতিতে সক্রিয় নন। তবে দলে তাঁর প্রতি সম্মান রয়েছে।’
গেরুয়া পতাকা আজ যতীন্দ্রর হাতে নেই। কিন্তু মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতা জারি রেখেছেন যথারীতি। সেটাই হয়তো তাঁর নতুন রাজনীতি।
