অরিন্দম বাগ, মালদা: এ যেন কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়ে আসার মতো পরিস্থিতি। মালদা মেডিকেলে (Malda Medical School & Hospital) গত ১২ অগাস্ট ২৪ ঘণ্টায় ১০ জন নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু হয়েছে রাজ্য স্তরে। আর সেই ঘটনার তদন্তে নেমে উঠে আসছে আরও ভয়ংকর তথ্য।
চলতি মাসের ১৭ তারিখ পর্যন্ত মালদা মেডিকেলে মৃত্যু হয়েছে ৬০ জন নবজাতকের। সম্ভবত এই সময়ে সারারাজ্যে সবচেয়ে বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে মালদা মেডিকেলেই। আর ২৪ অগাস্ট পর্যন্ত সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৭-এ।
এমন পরিস্থিতিতে মেডিকেল কর্তৃপক্ষকে খানিক স্বস্তি দিচ্ছে একটাই বিষয়। তা হল, বাইরে থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় মালদা মেডিকেলে শিশুদের ভর্তির পরিসংখ্যান। শিশুমৃত্যুর সঙ্গে মালদা মেডিকেলের নাম জড়িয়েছে ঠিকই, তবে এত বিপুল সংখ্যক শিশুমৃত্যুর ঘটনায় ঘুরিয়ে নার্সিংহোমগুলোকেই দায়ী করছে মেডিকেল কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, মৃতদের অধিকাংশই বিভিন্ন নার্সিংহোম থেকে রেফার হয়ে আসা শিশু। তবে এই ঘটনায় মেডিকেলের পরিষেবা নিয়ে একরাশ ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন ইংরেজবাজারের বিজেপি বিধায়ক অম্লান ভাদুড়ি।
স্বাস্থ্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মৃত ৬০ নবজাতকের মধ্যে ২০ জনকেই বিভিন্ন নার্সিংহোম থেকে মালদা মেডিকেলে রেফার করা হয়েছিল। এছাড়া রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল এবং ভিনরাজ্যের সরকারি হাসপাতাল থেকেও আশঙ্কাজনক অবস্থায় শিশুদের মেডিকেলে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হয়েছিল। তবে ওই ৬০ জনের প্রাণ আর শেষ অবধি বাঁচানো যায়নি। এই পরিসংখ্যান সামনে আসার পরই নড়েচড়ে বসে স্বাস্থ্য দপ্তর ও জেলা প্রশাসন। এরপর একাধিক নার্সিংহোমে অভিযান চালানো হয়। তারা আশঙ্কাজনক অবস্থায় শিশুদের রেফার করে দায় ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছে কি না, সেদিকটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রশাসনের এক আধিকারিকের দাবি, ইতিমধ্যে কয়েকটি নার্সিংহোমে গাফিলতির বিষয় নজরে এসেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি চাওয়া হয়েছে।
মালদা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ পার্থপ্রতিম মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘গত ১ অগাস্ট থেকে ২৪ অগাস্ট পর্যন্ত মালদা মেডিকেলে ৭৭ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।’ তবে তাঁর যুক্তি, সাধারণত মালদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে প্রতিদিন তিন থেকে চারজন শিশুর মৃত্যু হয়। কেন? পার্থপ্রতিমের জবাব, ‘প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় আশঙ্কাজনক অবস্থায় ওই শিশুগুলিকে মালদা মেডিকেলে রেফার করা হয়েছিল।’
জেলা প্রশাসনের এক আধিকারিকের মতে, চলতি মাসের প্রথম দুই সপ্তাহে ৬০ জন মৃত শিশুর মধ্যে ১৬ জন মালদা মেডিকেলেই জন্মেছিল। সেই হিসেবে মেডিকেলে জন্ম নেওয়া শিশুদের মৃত্যুর হার কম। তাঁর দাবি, মৃতদের বেশিরভাগকেই আশঙ্কাজনক অবস্থায় বিভিন্ন নার্সিংহোম থেকে রেফার করা হয়েছিল। সেই নার্সিংহোমগুলির তথ্য হাতে আসার পর অভিযান চালানো হচ্ছে।
এদিকে শিশুমৃত্যু নিয়ে মেডিকেলের পরিকাঠামো ও পরিষেবা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ইংরেজবাজারের বিজেপি বিধায়ক অম্লান ভাদুড়ি। তাঁর অভিযোগ, ‘মালদা মেডিকেলের পরিকাঠামো ভালো নয়। তৃণমূল সরকারের জমানায় চিকিৎসকদের পানিশমেন্ট পোস্টিং হিসেবে মালদা মেডিকেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই চিকিৎসকরা ঠিকমতো পরিষেবা দিচ্ছেন না। অস্থায়ী কর্মী সরবরাহের দায়িত্বে থাকা কোম্পানিগুলোও বেতন ঠিকমতো না দেওয়ায় পরিষেবায় প্রভাব পড়ছে।’
অম্লানের সাফাই, ‘বাম জমানায় ধুঁকতে থাকা জেলা হাসপাতালকে মেডিকেল কলেজ করে দেওয়া হয়েছিল। পরিকাঠামোর সেই সমস্যা কাটিয়ে ওঠার আগেই তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসে। তৃণমূল সরকার মেডিকেল কলেজের কাজে দুর্নীতি করেছে। মেডিকেল কলেজের পুরো প্রক্রিয়া আমাদের ঠিক করতে হবে। এটা এক দিনে সম্ভব নয়। ইতিমধ্যে এ নিয়ে আমরা বৈঠক করেছি।’
এদিকে, শিশুমৃত্যুর কারণ খতিয়ে দেখতে ২৪ অগাস্ট মালদা মেডিকেল সহ চারটি মেডিকেল কলেজের কাছে রিপোর্ট চেয়েছে স্বাস্থ্য ভবন। রেফার কেস, মৃত্যুর কারণ, চিকিৎসকের পরামর্শ, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা এবং এসএনসিইউয়ের যন্ত্রাংশ সংক্রান্ত তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে।

