কল্লোল মজুমদার, মালদা: টিকিট কাউন্টারের পাশ দিয়ে মালদা (Malda Information) স্টেশনে ঢোকার পর ডানদিকে আর বাঁদিকে পরপর অনেকগুলো দোকান। চা, কফি, নানারকম বিস্কুট, মুখরোচক খাবারের পাশাপাশি মিল অর্থাৎ ভাত-ডাল ইত্যাদিও বিক্রি হয় সেসব দোকানে। চা পানের ছুতোয় খোলামেলা কথা হচ্ছিল এমনই এক দোকানির সঙ্গে। আরেক ‘চাওয়ালার’ প্রসঙ্গ উঠতেই মালদা স্টেশনের (Malda Station) সেই চাওয়ালা কেমন যেন গুটিয়ে গেলেন। কথায় কথায় বলে ফেললেন, ‘কাল-পরশু মিলিয়ে নেট ১০ হাজার টাকার ক্ষতি।’ কেন?
‘মোদি আসছেন যে’।
তাঁর ওই পাঁচ ফুট বাই তিন ফুট দোকানের দৈনিক ভাড়া ৫ হাজার টাকা। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার জন্য শুক্র ও শনিবার দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশ পেয়েছেন। দু’দিনের ভাড়ায় ক্ষতির এই হিসেবে কিন্তু বিক্রিবাটার অঙ্কটা ধরা নেই। ধরলে আরও কয়েক হাজার বাড়বে। গত কয়েকদিন ধরে ভাত বিক্রি করতেও নাকি না করা হয়েছে। তাতে ব্যবসাও মন্দা।
মালদা থেকে বর্ধমান যাওয়ার বিবেক এক্সপ্রেস ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্মে আসছে- মালদা টাউন স্টেশনের মাইকে এমন ঘোষণা হতেই রুটি-তরকারি বিক্রি করতে ছুটতেন স্বাধীন কর্মকার, শিবু দাসরা। কিন্তু আজ একেবারেই আলাদা দিন। কারণ শনিবার মালদায় আসছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (PM Narendra Modi)। মালদা টাউন স্টেশন থেকে কামাখ্যাগামী বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেনের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। আর তাই এখন টাউন স্টেশন চত্বর মুড়ে ফেলা হয়েছে চরম নিরাপত্তায়। প্রতি মুহূর্তে স্টেশন চত্বর এবং প্ল্যাটফর্মের আনাচে-কানাচে চলছে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি। ঘুরে বেড়াচ্ছে রেলের স্নিফার ডগ। তাই এখন আর স্টেশন চত্বরে কিংবা প্ল্যাটফর্মে গিয়ে রুটি-তরকারি কিংবা অন্য সামগ্রী বিক্রি করার অনুমতি নেই স্বাধীন, শিবুদের।
শুধু কি তাই, নিরাপত্তার খাতিরে স্টেশন চত্বরের বাইরে থাকা বেশ কিছু দোকানের সামনে দিয়েও তৈরি করা হয়েছে প্যান্ডেল। ফলে আগামী দু’দিন যে মালদা টাউন স্টেশন চত্বরে থাকা জনা চল্লিশেক হকার কিংবা চত্বরে থাকা দোকানদারদের মাথায় হাত তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
কথা হচ্ছিল স্বাধীন সরকারের সঙ্গে। তাঁর কথায়, ‘কাজ নেই কর্ম নেই, তাই বাধ্য হয়েই পেটের দায়ে হকারি করতে হচ্ছে। আমের সময় আম আর অন্য সময় রুটি-তরকারি বিক্রি করি। লুকিয়ে চুরিয়ে প্ল্যাটফর্মে ঢুকেও বিক্রি করি কোনও কোনও সময়। কিন্তু আর দু’দিন পরেই প্রধানমন্ত্রী আসছেন। তাই আর এখন প্ল্যাটফর্মে গিয়ে বিক্রি করতে পারছি না।’
ছোট ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি একটু বড় ব্যবসায়ীদের কথাও বলতে হয়। বড় দোকানের বড় বড় হিসেব। যাত্রীদের পেট ভরাতে ভাত-ডাল, পুরি-সবজি সব মেলে। বসে খাওয়ার জায়গা আছে। ভাড়া দৈনিক ১৫ হাজার টাকা প্রায়। দু’দিন বন্ধ। ৩০ হাজার টাকা ক্ষতির অঙ্কটা জলের মতো সহজ।
ওই টিকিট কাউন্টারের দিক দিয়ে প্ল্যাটফর্মে ঢোকার মুখে অন্য সময় রাস্তার উপর বসে সারি সারি চায়ের দোকান। চপ-ঘুগনির দোকান। আবার মাটিতে বসে অনেকে বিক্রি করেন মাটিতে বসার প্লাস্টিক। বৃহস্পতিবার সেই দৃশ্য চোখে পড়ল না। রাস্তার দুই ধারে থাকা স্থায়ী দোকানগুলির সামনে তৈরি করা হয়েছে বাঁশ-কাপড়ের প্রাচীর। ওই এলাকার এক চা বিক্রেতার গলায় আক্ষেপের সুর, ‘প্রধানমন্ত্রী আসছেন ভালো কথা। কিন্তু আমাদের ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছে। আগামী দু’দিন কী যে হবে, কীভাবে বাড়ির উনুনে ভাত ফুটবে তা বলতে পারছি না’।
‘আমাদের কথা কেউ তুলে ধরে না’। সাংবাদিক পরিচয় দিতেই ঝাঁঝিয়ে উঠলেন এক ছোট ব্যবসায়ী। ‘দু’তিনদিন যে আমাদের ব্যবসা কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে সে ছবি কিন্তু তুলছেন না কেউই, শুনছেন না আমাদের কথা’, বলছিলেন শিবু দাস। স্টেশন চত্বরের বাইরে এককোণে তাঁর চায়ের দোকান রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার জন্য কড়াকড়িতে সেই দোকান গত কয়েকদিন ধরে বন্ধ রাখতে হয়েছে।
মোদির সফরকে কেন্দ্র করে এখন আলোয় ভাসছে মালদা টাউন স্টেশন। স্টেশন চত্বরে রিলস তৈরি করার জন্য ভিড় করছেন কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। লাল-নীল-হলুদ আলো ঝিকমিক করছে এই সব ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের অন্ধকার মুখগুলোয়। আর কী অদ্ভুত ব্যাপার, তাতে তাঁদের মুখের অন্ধকার বাড়ছে বই কমছে না।
