গোপালভোগ, ল্যাংড়া আর হিমসাগর বাগানে শেষ হয়েছে এক মাস আগেই। তবে বাজারে শেষ মানেই পরের বছরের জন্য অপেক্ষা নয়। সারাবছর এইসব আমের স্বাদ মানুষ উপভোগ করতে পারেন আমসত্ত্বের মাধ্যমে। ইংরেজবাজারের কোতুয়ালি অঞ্চলের কল্যাণপুর গ্রামে এখন কুইন্টাল কুইন্টাল আমসত্ত্ব মজুত রয়েছে। মরশুমের শেষ আম ফজলির আমসত্ত্ব তৈরিতে মশগুল আস্ত গ্রাম। লিখলেন জসিমুদ্দিন আহম্মদ।
মালদা: দুধে আমসত্ত্ব ফেলে কলা দিয়ে মেখে সেই অমৃত খাওয়া বাঙালিকে শিখিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তবে শুধু দুধে মিশিয়ে নয়, আমসত্ত্ব খাওয়ার নানা আঙ্গিক রয়েছে। বাঙালি রান্নাতেও এর ব্যবহার করা হয়। ইতিহাস বলছে, মোগল বাদশারাও আমসত্ত্বের স্বাদে আপ্লুত ছিলেন। একসময় মালদার আমসত্ত্ব (Malda Aamsotto enterprise) নিয়মিত যেত বাকিংহাম প্যালেসে। জেলার ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, এখনও প্রতি বছর এই জেলায় প্রায় ১০০ কোটির আমসত্ত্বের ব্যবসা হয়।
বিভিন্ন প্রজাতির আম থেকেই আমসত্ত্ব তৈরি হতে পারে। কিন্তু রং, গন্ধ আর স্বাদে সবাইকে টেক্কা দেয় গোপালভোগ থেকে তৈরি আমসত্ত্ব। এর দামও বেশি। সাধারণত আমসত্ত্বের দাম কিলোপ্রতি ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা হয়ে থাকে। তবে আমসত্ত্ব তৈরিতে হ্যাপাও কম নয়। পাকা আম কেটে, ছিলে, তার রস বের করে ছাঁকা হয়। এরপর চড়া রোদে কাপড়ের উপর একের পর এক পরত চাপিয়ে সেই রস শুকোতে হয়। কোনও কারণে রোদ কম হলে আমসত্ত্বের (Aamsotto) রং কালচে হয়ে যাবে। নির্মীয়মাণ আমসত্ত্বে বৃষ্টির জল পড়লে পচে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। খোলা জায়গায় রাখা আমসত্ত্বের চালিতে কাক বা অন্য পাখি বসতে পারে। তাদের বিষ্ঠায় গোটা চালির আমসত্ত্ব নষ্ট হতে পারে। তাই মহিলাদের সেই চড়া রোদের মধ্যেই বসে থাকতে হয়।
কল্যাণপুর গ্রামের প্রৌঢ়া সরস্বতী দাস দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে আমসত্ত্ব তৈরি করছেন। এ বছরও প্রায় সাড়ে চার কুইন্টাল আমসত্ত্ব তৈরি করেছেন। তাঁর কথায়, ‘আমের ফলন ভালো হওয়ায় প্রায় সব প্রজাতির আমেরই আমসত্ত্ব তৈরি করেছি। ভালো রোজগার হবে আশা করছি। এখন ফজলির আমসত্ত্ব তৈরিতে হাত লাগিয়েছি।’ এলাকার আরেক গৃহবধূ ছবি দাস জামাইষষ্ঠীর আগে থেকে আমসত্ত্ব তৈরির কাজে হাত লাগিয়েছিলেন। আম যতদিন পাওয়া যাবে, তাঁরা আমসত্ত্ব তৈরি করবেন। ভাদ্র মাস পর্যন্ত কাজ চলবে। গোপালভোগ দিয়ে কাজ শুরু হয়। হিমসাগর, ল্যাংড়া, লক্ষ্মণভোগ, ফজলি, আশ্বিনা সহ একাধিক প্রজাতির আমের আমসত্ত্ব তৈরি হবে। এক কিলো আমসত্ত্ব তৈরি করতে অন্তত ১৫ কিলো আম লাগবে। তাঁর কথায়, ‘আমরা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মেলায় যেমন আমসত্ত্ব বিক্রি করি, তেমনই পাইকারি ও খুচরো বাজারেও বিক্রি করি। আগেরবার প্রায় ছ’কুইন্টাল আমসত্ত্ব তৈরি করেছিলাম। তবে প্রথমে রোজগারের বিষয়টি বুঝতে পারি না। মরশুমের শেষে লাভ বুঝতে পারি। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আমসত্ত্ব তৈরি করি। যা রোজগার হয়, মোটামুটি চলে যায়। শাশুড়ির কাছে এই কাজ শিখেছি। এখন পুত্রবধূ সহ পাড়ার মেয়েদের শেখাচ্ছি।’
মালদা ম্যাঙ্গো মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (Malda Mango Retailers Affiliation) সভাপতি উজ্জ্বল সাহা জানান, জেলায় পাঁচ লাখ মেট্রিক টন পর্যন্ত আম উৎপাদন হতে পারে। এই মরশুমেও তিন লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হয়েছে। এখানে আম থেকে আমপানা, আমের জ্যাম, জেলি, আচার এবং সবচেয়ে বড় উপজাত দ্রব্য আমসত্ত্ব তৈরি হয়। তাঁর কথায়, ‘এখানকার তৈরি আমসত্ত্ব গোটা বিশ্বে পাওয়া যায়। আমেরিকার বিভিন্ন শপিং মল ও কাউন্টারেও মালদার আমসত্ত্বের দেখা মেলে। গত বছর আমরা এক থেকে দেড় হাজার টাকা কিলো দরে আমসত্ত্ব বিক্রি করেছি। এই শিল্পে প্রতি বছর অন্তত ১০০ কোটি টাকার ব্যবসা হয়। গ্রামীণ মহিলাদের অর্থনীতি এই ব্যবসার উপর নির্ভর করে। তাঁরাই আমসত্ত্ব তৈরি করেন।’

