সৌরভকুমার মিশ্র, হরিশ্চন্দ্রপুর: মালদা জেলায় সরকারি সহায়কমূল্যে ধান কেনা নিয়ে জটিলতা অনেক (Malda)। অনেক ক্ষেত্রে খাতায়-কলমে ধান কেনা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে সেই ধানের কোনও অস্তিত্বই নেই। বিক্রেতা হিসেবে যে চাষির নাম দেখানো হচ্ছে, তিনি আদৌ সেই ধান বিক্রি করেননি (Paddy Rip-off)। সরকার সেই বিক্রির প্রেক্ষিতে যে টাকা দিচ্ছে কৃষকের অ্যাকাউন্টে, সেটার একটা বড় অংশ শেষপর্যন্ত ঘুরপথে চলে যাচ্ছে মিল মালিকদের পকেটে। আর সেই টাকার অঙ্কটা কিন্তু মোটেই কম নয়।
পশ্চিমবঙ্গে একজন কৃষক খরিফ ও রবি মরশুম মিলিয়ে সরকারি সহায়কমূল্যে সর্বাধিক ৯০ কুইন্টাল ধান বিক্রি করতে পারেন। তবে, ২০২৫-’২৬ মরশুমে, এক দফায় ১৫ কুইন্টাল পর্যন্ত বিক্রির কথা বলা হয়েছে। প্রশাসন তো মনে করছে, এর ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের বেশি সুবিধা হবে। কিন্তু আদতে সুবিধা হচ্ছে মিল মালিকদের। তাঁদের ক্ষেত্রে তো আর ধান কেনার কোনও সর্বোচ্চ সীমা নেই। মিল মালিকদের একাংশ সরকারি হিসেবে যে ধান কেনার হিসেব দেখাচ্ছে, ততটা ধান তারা আদৌ কিনছে না। কোনও কোনও কৃষকদের কিষান ক্রেডিট কার্ড ‘ভাড়া’ নিয়ে এই প্রতারণা চলছে। ধান বিক্রি না করেও কোনও কোনও কৃষকের অ্যাকাউন্টে সরকারি সহায়কমূল্যের টাকা ঢুকছে। সেই টাকার একটা কমিশন পাচ্ছেন সেই কৃষক। বাকি টাকা ঢুকছে মিল মালিকের পকেটে।
কীভাবে চলছে এই প্রতারণা? ধরা যাক, একজন চাষির নামে কিষান ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। কিন্তু তিনি এবার ধান চাষ করেননি। তাঁর কার্ড ফড়েদের মাধ্যমে পৌঁছে গেল মিল মালিকদের হাতে। ফড়েদের মাধ্যমেই সেই কৃষকের নামে অনলাইনে স্লট বুকিংও হয়ে গেল দ্রুত। সেই কৃষক কোনও ধান বিক্রিও করলেন না। অথচ, খাতায়-কলমে দেখানো হল তিনি অমুক ধান ক্রয়কেন্দ্রে ১৫ কুইন্টাল ধান বিক্রি করেছেন। সরকারি আধিকারিকদের একাংশের মদতেই এই ‘ভূতুড়ে’ ধান বিক্রির নথিপত্রে কোনও ফাঁকফোকর রইল না। যথাসময়ে সেই কৃষকের অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকে গেল। কার্ড ‘ভাড়া দেওয়ার মজুরি বাবদ’ তিনি কিছু টাকা পেলেন। কিছু টাকা পেলেন সেই ফড়ে। বাকি টাকা মিল মালিকের। পরে সেই মিল মালিক হয় কম দামে নিম্নমানের ধান কিনে হিসেব মিলিয়ে দিলেন। অথবা গত বছরের স্টক থেকে হিসেব মিলিয়ে দিলেন। আর এলাকাপিছু ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা এভাবেই পূরণ হয়ে গেলে স্থানীয় অনেক চাষিই আর সহায়কমূল্যে ধান বিক্রি করতে পারবেন না। তাঁরা তখন বাধ্য হবেন কম দামে ফড়েদের কাছে ধান বিক্রি করতে।
অগ্রগামী কিষান সভার জেলা সভাপতি অজিত সাহার কথায়, ‘অনেক কৃষকের কিষান ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। কিন্তু তাঁদের অত ধান হয় না। দালালরা গ্রামে গিয়ে তাঁদের কাছ থেকে কার্ড সংগ্রহ করে নিচ্ছে এবং মিল মালিকদের দিচ্ছে। এই সমস্ত কার্ড সামনে রেখে বাজার থেকে কম দামে ধান কিনে সেজন্য আবার সরকারি ভরতুকি তুলে নিচ্ছে।’
পাশাপাশি আরও অভিযোগ, এই ধান বিক্রি করতে গিয়ে কৃষকদের অনলাইনে স্লট বুক করতে গিয়েও দালালচক্রের খপ্পরে পড়তে হচ্ছে। বুকিং করতে স্লটপিছু এক হাজার টাকা করে দালালরা আদায় করছেন কৃষকদের কাছ থেকে। অনেকেই আবার স্লট বুক করলেও ধান বিক্রি করতে পারছেন না। তাঁর নামে বুক করা স্লটে অন্য কেউ ধান বিক্রি করে চলে যাচ্ছেন। প্রশাসন বলছে, এভাবে স্লটে নাম পরিবর্তনের পেছনে এলাকার সাইবার ক্যাফেগুলিতে সক্রিয় দালালচক্রের ভূমিকা রয়েছে। তারাই কৃষকদের স্লট বুক করছে, আবার কিছুক্ষণ পর ওটিপি নিয়ে ভুল বুঝিয়ে সেই স্লট বাতিলও করে দিচ্ছে। সেই জায়গায় অন্য নাম ঢুকছে।
এপ্রসঙ্গে হরিশ্চন্দ্রপুর-১’এর বিডিও সৌমেন মণ্ডল বলেন, ‘স্লট বিক্রিতে যে বেনিয়ম হচ্ছে, তা আমরাও লক্ষ করেছি। এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাছাড়া ধান বিক্রি নিয়ে যে অভিযোগ উঠছে, সেগুলি আমরা খতিয়ে দেখছি।’
