অরিন্দম বাগ ও আজাদ, মালদা ও মানিকচক: পাহাড়ে বিপর্যয় নেমে এসেছে। সেখানে ত্রাণ দিতে পৌঁছে গিয়েছেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (CM Mamata Banerjee)। পুনর্গঠনের কাজও তদারকি করছেন। কিন্তু গত দুই মাস ধরে ভাঙন ও বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে মালদা (Malda)-র বিস্তীর্ণ এলাকায় নাভিশ্বাস উঠলেও সেদিকে নজর নেই কারও। এমনকি জেলার পরিস্থিতি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দরবার করতেও শোনা যায়নি মালদার জনপ্রতিনিধিদের। এই পরিস্থিতিতে ভাঙন রোধের দাবি নিয়ে সোমবার আন্দোলনে নামলেন ভূতনির বাসিন্দারা। আন্দোলনে শামিল হতে দেখা গিয়েছে ছাত্রদের। আন্দোলনকারী ছাত্রদের মধ্যে মোহাম্মদ মুসাদ বলেন, ‘গত দুই বছর ধরে নদীবাঁধ না থাকার কারণে আমাদের নাজেহাল দশা হয়েছে। কিন্তু আমাদের খোঁজ নিতে কেউ আসে না। একদিনের বন্যাতে উত্তরবঙ্গে ছুটে যেতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু গত দুই বছর ধরে আমাদের দুর্দশার শেষ নেই। মুখ্যমন্ত্রী তো দূর, কোনও মন্ত্রীও আমাদের খোঁজ নিতে আসেন না।’
তবে সমালোচনা উড়িয়ে রাজ্যের সেচ প্রতিমন্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিনের বক্তব্য, ‘গঙ্গাভাঙনের সমস্যার সব বিষয় মুখ্যমন্ত্রীর জানা৷ দিদি অনেকবার প্রশাসনিকভাবে এ নিয়ে বৈঠক করেছেন৷ ভূতনি নিয়ে অনেকবার আলোচনাও হয়েছে৷ যেসব কাজ হচ্ছে, তাঁর নির্দেশ মোতাবেকই হচ্ছে৷ তবে উত্তরবঙ্গে যে বিপর্যয় হয়েছে, সেটা আরও ভয়ানক৷ মুখ্যমন্ত্রী সেখানে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে গিয়েছেন৷ শুধু দুর্গতরা নন, সকলেই চাইছেন গঙ্গাভাঙন সমস্যার সমাধান হোক৷’ ভাঙন সমস্যার সমাধানে কেন কেন্দ্রীয় সরকার এগিয়ে আসছে না, তা নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন সাবিনা।
বিজেপির দক্ষিণ মালদা সাংগঠনিক জেলা সভাপতি অজয় গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘উত্তরবঙ্গের বিপর্যয়ের সময় মুখ্যমন্ত্রী কার্নিভাল নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন৷ তাঁর আগে বিজেপি দুর্গত মানুষদের পাশে পৌঁছে গিয়েছে দেখে বিচলিত মুখ্যমন্ত্রীকে বারবার পাহাড়ে ছুটে যেতে হচ্ছে৷ অথচ মালদায় ভূতনি চারবার জলে ডুবেছে। কারণ, বিশেষজ্ঞরা মানা করা সত্ত্বেও ওঁর মন্ত্রীর কথামতো নির্দিষ্ট জায়গায় মাটির বাঁধ দেওয়া হয়েছে৷ সেটাও জলস্তর বৃদ্ধি হওয়ার পর দেওয়া হয়েছে৷ এই সব ঘটনা মুখ্যমন্ত্রী জানেন৷ সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মুখে পড়ার ভয়ে মুখ্যমন্ত্রী ভূতনিতে আসছেন না৷ মালদাকে বাদ দিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছেন৷ আসলে ওঁদের কাছে মালদা তো দুয়োরানি।’
এদিকে, দক্ষিণ মালদার কংগ্রেস সাংসদ ইশা খান চৌধুরী বলেন, ‘নদী ও ভাঙনের সমস্যাটা কেন্দ্র ও রাজ্যকে মিলে সমাধান করতে হবে। কিন্তু দিল্লি ও কলকাতার নেতা-নেত্রীরা শুধু দায় ঠেলাঠেলি করছেন।’
এই পরিস্থিতিতে ভাঙন রোধের দাবিতে সোমবার ভূতনিতে মিছিল করল ছাত্র ও তরুণরা। এদিনে ভূতনি ব্রিজ থেকে মানিকচক বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত মিছিলের ডাক দেওয়া হয়েছিল। তবে হঠাৎ সিদ্ধান্ত বদল করে ছাত্র ও তরুণরা বিডিও অফিস চত্বরে জমায়েত করেন। মানিকচকের বিডিও অফিসের সামনে রাজ্য সড়কের উপর বসে পড়েন মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা। স্থায়ী ভাঙন রোধের কাজ ও বাঁধ নির্মাণের দাবিতে মালদা-চাঁচল রাজ্য সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ চলতে থাকে। চলে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের বিরোধী স্লোগান। বালির বস্তা ফেলে লোক দেখানো কাজ নয়, স্থায়ী ভাঙন রোধের কাজ করতে হবে বলে দাবি তোলা হয় মিছিল থেকে। ভূতনিকে বাঁচাতে পাকা বাঁধ নির্মাণের দাবিও তোলেন আন্দোলনকারীরা।
নদীবাঁধ না থাকায় পরপর দুই বছর গঙ্গা ও ফুলহরের জলে প্লাবিত হয়েছে ভূতনির বিস্তীর্ণ এলাকা। চলতি বছরে পরপর চার দফার বন্যা পরিস্থিতিতে নাজেহাল দশা ভূতনিবাসীর। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ভূতনির দক্ষিণ চণ্ডীপুর ও হীরানন্দপুর অঞ্চলের কেশরপুর, কালুটোনটোলার সদ্যনির্মিত বাঁধ গঙ্গা ও ফুলহরের জলের স্রোতে তাসের ঘরের মতো ভেঙে গিয়েছে। ভূতনিবাসীর অভিযোগ, রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের উদাসীনতায় ভূতনির এই দশা। বালির বস্তা দিয়ে ভাঙন রোধের কাজের মাধ্যমে গঙ্গাকে রোখা যাবে না বলে বারবার দাবি জানিয়েছেন ভূতনিবাসী। তা সত্ত্বেও কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে রাজ্য সরকার বালির বস্তা দিয়ে ভাঙন রোধের কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। তার পরিণাম চলতি বছরে প্রায়ই ২ কিলোমিটারের বেশি এলাকা গঙ্গাগর্ভে তলিয়ে যায়। ভূতনিবাসীর অভিযোগ, ভাঙন রোধে রাজ্য সরকারের বরাদ্দ অর্থ দালালচক্র ও ঠিকাদার লুটপাট করে খাচ্ছে।
