মালদা: বড় বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর তো বটেই, পাড়ার দোকানের শোকেসে কোরিয়ান নুডলের প্যাকেট ঝলমল করছে। রেস্তোরাঁয় কোরিয়ান ডিশের রমরমা। বন্ধুদের মধ্যে কে-ড্রামা, বিটিএস আর্মি নিয়ে জোর আলোচনা। এসব প্রসঙ্গ নিয়ে খোলা হচ্ছে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ। কোরিয়ান সংস্কৃতিতে এখন এতটাই বুঁদ জেন জেড যে, এটাই এখন পাচারকারীদের নতুন টোপ।
প্রেমের ফাঁদ পাতা, দামি স্মার্টফোন বা দামি পোশাক-আশাকের টোপ দিয়ে ফুঁসলে নিয়ে যাওয়ার কথা আগে শোনা গিয়েছে। কিন্তু কোরিয়ান ব্যান্ডে কাজের সুযোগ করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে পাচারের ছক? মঙ্গলবার দুপুরে মালদার (Malda) যে দুই স্কুল ছাত্রী নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল, সেই রাতেই তাদের খোঁজ মেলে শিলিগুড়িতে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেই পাচারের এই নতুন টোপ সম্পর্কে জানা গিয়েছে। আর তারপর কেবল তাদের বাড়ির লোকজন নয়, চক্ষু চড়কগাছ পুলিশেরও। কোরিয়ার সংস্কৃতির টানে পড়ে যে এমন কাণ্ড ঘটতে পারে, সেকথা কেউ ভাবতেই পারেনি। সঠিক সময়ে পরিবার ও পুলিশ তৎপরতা শুরু করায় শেষমেশ উদ্ধার করা গিয়েছে ওই দুজনকে। বুধবার দুই স্কুল ছাত্রীকে পুলিশ শিলিগুড়ি থেকে ফিরিয়ে এনেছে। তবে এদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, তাদের আগে কাউন্সেলিং করা হবে। পরবর্তীতে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এই বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার অনুপম সিংহ বলেন, ‘অভিযোগ হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে যে এর পেছনে কারা আছে।’
এদেশ থেকে কোরিয়ার দূরত্ব হাজার পাঁচেক কিলোমিটার। কিন্তু মালদার জেন জেডদের মধ্যে খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, নিজেদের বুকের মধ্যে কোরিয়াকে লালনপালন করে অনেকেই। বিশেষ করে ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সিরা তো কোরিয়া অন্তপ্রাণ। ইন্টারনেটের সৌজন্যে কোরিয়ার ওয়েব সিরিজ, সিনেমা ও সেখানকার বিভিন্ন গানের ব্যান্ডের চমকপ্রদ ফ্যান-ফলোয়িং রয়েছে মালদার মতো শহরেও। শহরে রয়েছে কোরিয়ান খাবারের জন্য আলাদা রেস্তোরাঁ। কিমচি বা রামেনের মতো কোরিয়ান ডেলিকেসি এখন আপনি চাইলেই পাবেন মালদা শহরের বুকেও। কথা হচ্ছিল কলেজ পড়ুয়া কুণাল পালের সঙ্গে। তাঁর পছন্দের খাবার ঝাল ঝাল নুডলস বা রামেন। বললেন, ‘কোরিয়ান বিভিন্ন ওয়েব সিরিজ দেখেই আমি এই ধরনের খাবার খেতে শিখেছি। এখন তো আশপাশের দোকানেও পাওয়া যাচ্ছে এই নুডলস। তাছাড়া অনলাইনে অর্ডার করলে তো বাড়ি এসে দিয়ে যাচ্ছে।’ কুণাল তো পোশাকের ক্ষেত্রেও নাকি কোরিয়ান ব্র্যান্ড বেছে নেন। মালদাতেই মেলে সেসব।
আরেক কলেজ ছাত্রের কথায়, ‘আমাদের বিভিন্ন বন্ধুদের সোশ্যাল মিডিয়ার গ্রুপ ও আড্ডাতেও কোরিয়ান ফ্যাশন, সেখান অভিনেতা-অভিনেত্রী ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হয়। যদি কেউ সেসব নিয়ে আপডেটেড না থাকে, তাহলে তাকে আমরা পাত্তাই দিই না। গ্রুপ থেকে বাদ দিয়ে দিই।’ সেদেশের ওয়েব সিরিজগুলি, টলিউড বলিউড বা হলিউডের থেকে একেবারে অন্যরকম। এমনটাই দাবি করছে তারা। ‘কে-ড্রামার চিত্রনাট্যের সঙ্গে বাস্তবের অনেকটাই মিল থাকে। তাই আমাদের দেখতেও ভালো লাগে। কোরিয়ান ওয়েব সিরিজ বা সিনেমার ধারেকাছে নেই অন্য কোনও দেশের সিনেমা। সেদেশের ব্যান্ডগুলোরও ফ্যান আমরা।’ বলছিলেন বিপ্লব বর্মন।
এই সমস্ত সিনেমা বা কোরিয়ান ব্র্যান্ডের গান শুনে তাদের ফ্যাশন স্টাইল কিংবা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ সমস্তকিছুই অনুসরণ করছে বর্তমান প্রজন্ম। সোশ্যাল মাধ্যমে প্রভাবিত হচ্ছে যুব সমাজ। আর প্রতারকরাও নিজেদের ‘আপডেট’ করে নিচ্ছে। যার উদাহরণ মালদার সেই দুই ছাত্রীর ঘটনা। অনলাইনে কোরিয়ান গেম খেলতে ভালোবাসত তারা। প্রতারকরা সেই বুঝে ফাঁদ পাতে। উদ্ধার হওয়া নাবালিকাদের বয়ান অনুযায়ী, সাত মাস আগে থেকে তাদের অ্যাপের মাধ্যমে কোরিয়ান ভাষা ও সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ শেখানো হচ্ছিল। মালদার নাবালিকারা কোরিয়ান ভাষা বলার ক্ষেত্রে সড়োগড়ো হয়ে উঠেছিল। এরপর তাদের একটি কোরিয়ান ব্যান্ডে কাজের সুযোগ দেওয়ার টোপ দেওয়া হয়। দুই নাবালিকাকে অ্যাপের পেছনে থাকা পাচারকারীরা ভুটান সীমান্ত জয়গাঁয় যেতে বলেছিল। সেইমতো দুজনে মঙ্গলবারই জয়গাঁর উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল। শেষপর্যন্ত দুজনকে উদ্ধার করতে পারলেও প্রলোভনের এই নতুন ফাঁদ উদ্বেগ বাড়িয়েছে পুলিশের।

