অরিন্দম বাগ, মালদা: বেলা ১১টা। প্রার্থনা সংগীতের পর সময় মতো ক্লাসরুমে ঢুকলেন শিক্ষক। প্রথমে রোলকল। তারপর বই খুলে শুরু হল পড়াশোনা। যখন শিক্ষক কোনও বিষয় বোঝাচ্ছেন, কোনও পড়ুয়া হয়তো আনমনে তাকিয়ে রয়েছে জানলা দিয়ে বাইরে। কেউ আবার বইয়ের পাতায় চোখ রাখলেও তার মন টানছে খেলার মাঠ। অর্থাৎ, শিক্ষকের পরিশ্রম সত্ত্বেও পড়াশোনা তাদের হচ্ছে না। স্কুলের পড়াশোনাকে আকর্ষণীয় করে তুলতে তাই এবার অন্য কৌশল প্রয়োগ করা হবে মালদা (Malda) জেলার প্রায় ৩ হাজার সরকারি স্কুলে। সেসব স্কুলে ক্লাসরুমের দেওয়াল থেকে শুরু করে গোটা স্কুলবাড়িটাই হয়ে উঠবে পড়াশোনার মাধ্যম।
সরকারি পরিভাষায় এই কৌশলের নাম ‘বিল্ডিং অ্যাজ লার্নিং এইড’ বা সংক্ষেপে বালা। এই বালা একটি শিক্ষাতাত্ত্বিক ধারণা, যেখানে স্কুলের দেওয়াল, মেঝে, সিঁড়ি, স্তম্ভ ও সীমানা প্রাচীরের মতো পরিকাঠামোকে শিক্ষার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ, শুধু শ্রেণিকক্ষের বই বা শিক্ষক নয়, বিদ্যালয়ের দেওয়াল, মেঝে, সিঁড়ি, জানলা, দরজা, উঠোন কিংবা অন্যান্য কাঠামোও হয়ে উঠতে পারে শেখার মাধ্যম। এই ধারণার মূল কথা হল, শিক্ষাকে শিশুর দৈনন্দিন পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করা। যেমন, দেওয়ালে গাণিতিক সংখ্যা, জ্যামিতিক আকার বা গুণের নামতা আঁকা থাকতে পারে। সিঁড়ির ধাপে সংখ্যা, বর্ণমালা বা বৈজ্ঞানিক তথ্য লেখা যেতে পারে। বিদ্যালয়ের উঠোনে মানচিত্র, সৌরজগৎ কিংবা স্থানীয় উদ্ভিদ নিয়ে শিক্ষামূলক চিত্র তৈরি করা যায়। ফলে শ্রেণিকক্ষের বাইরেও শিক্ষার্থীর শেখার সুযোগ তৈরি হয়।
এই বালা প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিকাঠামো ও স্থানীয় পরিবেশকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিশুদের বয়স ও পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বিভিন্ন স্থানে শিক্ষামূলক উপাদান যুক্ত করা হয়। এতে দেখে, ছুঁয়ে ও ব্যবহার করে শেখার সুযোগ তৈরি হয়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, এই পদ্ধতির অন্যতম সুবিধা হল, শেখা আরও আনন্দদায়ক ও বাস্তবভিত্তিক হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কৌতূহল, পর্যবেক্ষণক্ষমতা ও সৃজনশীলতা বাড়ে। আর সরকারি স্কুল মানেই তো পরিকাঠামোর সীমাবদ্ধতা। সীমিত শিক্ষাসামগ্রী থাকা সত্ত্বেও এই কৌশল অবলম্বন করে কম খরচে শেখার পরিবেশ সমৃদ্ধ করা যায়। মালদায় আগামী ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সরকারি স্কুলগুলির দেওয়াল পুরোপুরি রঙিন হয়ে উঠতে চলেছে।
জেলা শাসক রাজনবীর কাপুর বলেন, ‘ওয়ালস অ্যাজ ক্যানভাস, কেবল একটি সৌন্দর্যায়ন কর্মসূচি নয়, এটি শ্রেণিকক্ষের নতুন সংজ্ঞা। এতে সিঁড়ি বেয়ে পড়ুয়ারা শ্রেণিকক্ষে পৌঁছাতে পৌঁছাতে নামতা বা বর্ণমালা শিখে ফেলতে পারে। টিফিনের সময় বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে করতে বাস্তুতন্ত্র শিখে ফেলতে পারে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা স্কুলের পরিকাঠামোকেও নীরব শিক্ষকে পরিণত করেছি।’
নয়া এই কৌশলের প্রশংসা শোনা গিয়েছে শিক্ষকদের মুখেও। মালিহা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সুজয় মণ্ডল বলেন, ‘আমাদের স্কুলেও এই প্রকল্প প্রয়োগ করা হবে। এতে পড়ুয়ারা খেলার মাধ্যমে পড়াশোনা করতে পারবে। পাশাপাশি ছবির মাধ্যমে সমাজসচেতনতার বার্তাও দেওয়া হচ্ছে।’
এই কৌশলে পড়ুয়ারা কতটা সাড়া দেবে, সেটা এখনই বলা সম্ভব নয় ঠিকই। তবে উৎসাহ দেখিয়েছে অভিভাবক মহল। প্রদীপ সরকার নামে এক অভিভাবক মনে করেন, জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগ সরকারি স্কুলের মান অনেকটা উন্নত করবে। তাঁর কথায়, ‘বর্তমান সময়ে সরকারি স্কুলগুলির শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। অভিভাবকদের বেশিরভাগই তাঁদের ছেলেমেয়েদের সরকারি স্কুলের বদলে বেসরকারি স্কুলে পাঠাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। নতুন উদ্যোগে যদি সরকারি স্কুলগুলির প্রতি আগ্রহ বাড়ে, তবে তো ভালোই।’

