শুভঙ্কর চক্রবর্তী, মালবাজার: ‘ঘাট থেকে লোকজন নিয়ে তাড়াতাড়ি মোড়ে আয়, ওদের ডাম্পার যাবে আর আমাদের যাবে না তা হবে না। আমরাও তো প্যাকেট দিই তাহলে দু’দিন পর পর…’ মোবাইল কানে উত্তেজিত তরুণের চিৎকারে তখন আশপাশের দোকান থেকে চায়ের কাপ হাতে কয়েকজন রাস্তায় বেরিয়ে এসেছেন। বাগ্রাকোট মোড়ের ছোট জটলা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিল। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই রাস্তার উলটো দিকে দুটো ডাম্পার এসে দাঁড়াল। হাফ প্যান্ট আর জ্যাকেট পরা রোগা মতো একটি ছেলে দৌড়ে রাস্তা পেরিয়ে এসে উত্তেজিত তরুণের কানে কিছু একটা বলে সেবকের দিকে রওনা হল। তরুণটি খানিক শান্ত হলেন। কিছুক্ষণ পরে লুপ পুলের রাস্তা ধরে বাগ্রাকোট মোড়ে এসে দাঁড়াল কালো রংয়ের নামী কোম্পানির একটি জিপ গাড়ি। কানে হেডফোন লাগিয়ে স্টিয়ারিংয়ে বসে ছিলেন হোমরাচোমরা এক ব্যক্তি। উত্তেজিত তরুণ গাড়িতে উঠতে উঠতে জটলার দিকে ইশারা করে বললেন, ‘সবাই গাড়ি নিয়ে আয়। ওর নেতাগিরি আজকে ছোটাব।’
ডুয়ার্সে ঘুরতে আসা পর্যটকদের কাছে বাগ্রাকোট মোড় চা বিরতির পছন্দের জায়গা। সকালবেলা এসব দেখে কয়েকজন হকচকিয়ে গেলেও কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই মাঝবয়সি মহিলা দোকানির। সুপি নুডলস পরিবেশন করতে করতে তিনি বলে ওঠেন, ‘ইয়তো সদইকো কুড়া হো’ (এসব প্রতিদিনের ঘটনা)। দোকানির কথা যে মিথ্যা নয়, এলাকায় ঘুরলেই তার ভূরিভূরি প্রমাণ মিলবে। আসলে মাল বিধানসভার রাজনৈতিক ক্যানভাসে বালি খাদানের ছবি এখন বিশেষ রংয়ে আঁকা হচ্ছে৷
সবুজ চা বাগান আর স্নিগ্ধ অরণ্যের আড়ালে মালে চোরাবালির মতো লুকিয়ে আছে ক্ষোভের দীর্ঘশ্বাস। আর পাহাড়-সমতলের সন্ধিক্ষণে বইছে দুর্নীতির ফল্গুধারা। মাল ও ক্রান্তি- দুই ব্লক আর মাল পুরসভা- এই তিন জনপদ নিয়ে গড়ে ওঠা বিধানসভা ক্ষেত্রটির সমীকরণ বড়ই বিচিত্র (Mal Meeting Constituency)। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় ঘাসফুলের একচেটিয়া বাগান, কিন্তু ভেতরে কান পাতলে শোনা যায় ভাঙনের শব্দ।
এই জনপদের ক্ষমতার অলিন্দে এখন এক রাজপুত্রের ছায়া পড়েছে। বাম আমলের সেই ঋজু, সাদামাঠা বুলু চিকবড়াইক মন্ত্রী হয়ে ক্ষমতার চাদরে ঢাকা পড়ে গিয়েছেন। তাঁর যে স্বচ্ছ ভাবমূর্তি একসময় তৃণমূলের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন ছিল, আজ তা অনেকটাই ফিকে। রাজনীতির অলিন্দে গুঞ্জন, মন্ত্রীর পাওয়ার বাটনের নিয়ন্ত্রণ এখন তাঁর ছেলে অশোকের হাতে। রাঙ্গামাটি পঞ্চায়েতের প্রধান হয়েও অশোক যেন অলিখিত অধীশ্বর। সুপারস্পেশালিটি হাসপাতালের নিয়োগ থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কলকাঠি নাড়া- সর্বত্রই তাঁর নাম। ফলে বুলুর সেই পুরোনো টিআরপি এখন নিম্নমুখী। বাবার দীর্ঘদিনের অর্জিত স্বচ্ছ আকাশ আজ ছেলের উচ্চাকাঙ্ক্ষার মেঘে ঢাকা। ফলে ভোটারদের মনে সেই পুরোনো আবেগ ধূসর হয়েছে। তাঁরা আর মাটির মানুষ বুলুকে খুঁজে পাচ্ছেন না।
মাল পুরসভার অলিগলিতে কান পাতলে শোনা যায় দুর্নীতির মহাকাব্য। যে দুর্নীতির দায়ে স্বপন সাহাকে সিংহাসনচ্যুত হতে হয়েছে, সেই বিষবৃক্ষেরই ডালপালা এখন শহরের শিক্ষিত আর আমজনতার মনে বিতৃষ্ণার জন্ম দিয়েছে। অথচ দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েও স্বপন যেন এক ট্র্যাজিক হিরো। তৃণমূলের তরুণ তুর্কিদের বড় অংশ এখনও তাঁর ক্যারিশমায় মজে। ফলে স্বপনহীন মাল পুরসভায় অজয় লোহার বা পুলিন গোলদারদের গোষ্ঠী নিজেদের ঘর সামলাতেই হিমসিম খাচ্ছে। এই গৃহযুদ্ধ এতটাই প্রকট যে, দলের নেতারা এখন প্রকাশ্যে রাস্তার মোড়ে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ছেন।
বিধানসভাটির ভৌগোলিক চরিত্রে যেমন বৈচিত্র্য, রাজনীতির রসায়নেও তাই। একদিকে চা বলয়ের আদিবাসী আবেগ, অন্যদিকে নেপালি, রাজবংশী আর মুসলিম ভোটব্যাংক। এর মাঝেই নিঃশব্দে ঢুকে পড়েছে মতুয়া ফ্যাক্টর। ক্রান্তির চাপাডাঙ্গা আর চ্যাংমারির মতুয়া সমাজ এখন বিধানসভার রাজনীতির দাবার বোড়ে হয়ে উঠেছে। বিজেপিকে বাইরে থেকে নড়বড়ে মনে হলেও, নাগরাকাটার ধাঁচে আরএসএসের সেই গৈরিকীকরণ-এর চোরা স্রোত কিন্তু স্তব্ধ হয়নি। হিন্দুত্ববাদের শেকড় যখন চা বাগানের গভীরে নামছে, তখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শাসকবিরোধী ক্ষোভের অক্সিজেন। এই দুইয়ের রসায়নে পদ্ম শিবির নিঃশব্দে নিজেদের জমি তৈরি করছে।
শুধু ভাবমূর্তি ধূসর হওয়াই নয়, মাল-এর না পাওয়ার দুঃখ ঘোচাতে পারেননি বুলু। বারে বারে প্রতিশ্রুতি দিলেও রাজাডাঙ্গা ও কুমলাইয়ের সংযোগকারী চেল সেতুর জন্য এক কোদাল মাটিও কাটা হয়নি। দ্বিতীয় কলেজ বা চাপাডাঙ্গার বাঁধ, মন্ত্রী হয়েও কিছুই করতে পারেননি তিনি। উলটে মাল থেকে আদিবাসী কল্যাণ বোর্ডের হেড অফিস চলে গিয়েছে কলকাতায়। মাল মহকুমা হাসপাতালের সামনের চায়ের দোকানে সেসব নিয়ে তর্ক চলছিল। স্থানীয় বেকারির তৈরি বিস্কুটে কামড় দিয়ে ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি বললেন, ‘‘পুজোর উদ্বোধনেও মুখ্যমন্ত্রী বুলু দা-কে জিজ্ঞাসা করলেন কিছু লাগবে কি না। তখন ও ‘সব হয়ে গিয়েছে’ বলে হাসতে লাগল। এভাবে নিজে ভালো সাজতে গিয়ে আমাদেরই ক্ষতি করল।’’
মাল বিধানসভার রাজনীতির আসল চালিকাশক্তি অবশ্য আদর্শ নয়, বালি-পাথর-জমির অন্ধকার সাম্রাজ্য থেকেই এলাকার রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হয়। এখানকার নদীগর্ভ থেকে উঠে আসা বালি, বোল্ডার কিংবা সরকারি জমির দখল- সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ যার হাতে, এলাকার দাপটও তার। এই মাফিয়ারাজের নিয়ন্ত্রকরাই এখন স্থানীয় রাজনীতির কিংমেকার। বালি আর জমি মাফিয়ারা যখন নেতার খোলস পরে শাসকদলের মঞ্চে বসে থাকেন, তখন এলাকা দখল নিয়ে বিবাদ অবধারিত। মালে সেটাই হচ্ছে। এলাকা দখলের অর্থই হল অর্থের জোগান। নেতা আর পুলিশের সঙ্গে যার সেটিং যত মজবুত, ডালপালা তার ততই বিস্তৃত।
এই আধিপত্যের লড়াইয়ে তৃণমূল নানা খণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ডামডিমে বাবুয়া প্রসাদ বনাম তমাল ঘোষ, ওদলাবাড়িতে রাসেল সরকার বনাম তমাল গোষ্ঠী, কিংবা কুমলাইয়ে রাজু শর্মা বনাম বাদশা আহমেদ- প্রত্যেকেই যেন এক একটি স্বতন্ত্র দুর্গের অধিপতি। এদের এলাকা দখলের লড়াই থামাতে জেলা সভানেত্রী মহুয়া গোপের নাজেহাল দশা।
ক্রান্তি ব্লকে সমীকরণ আরও জটিল। ব্লক সভাপতি মহাদেব রায়ের সঙ্গে মন্ত্রীর শীতল যুদ্ধ এখন ওপেন সিক্রেট। তার ওপর সংখ্যালঘু নেতা মেহবুব আলমের ঘন ঘন রং বদল আর নৌশাদ সিদ্দিকীর সঙ্গে তাঁর গোপন বৈঠক শাসক শিবিরের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। ব্লকের সংখ্যালঘু ভোট যদি একটুও হেলে যায়, তবে ঘাসফুলের সাজানো বাগান শুকিয়ে যেতে সময় লাগবে না।
সব মিলিয়ে মাল বিধানসভা এখন এক জটিল গোলকধাঁধা। এখানে তৃণমূলের প্রধান প্রতিপক্ষ তৃণমূলই, বিজেপি নয়। শাসকদলের এই আত্মঘাতী লড়াই আর দুর্নীতির কলঙ্ক যদি নির্বাচনের আগে ধুয়ে ফেলা না যায়, তবে জয়ের মালা পরা কঠিন হবে। মালের পুর এলাকা বা শহরের ভোট যদি দুর্নীতির কারণে হাতছাড়াও হয়, তৃণমূলের শেষ আশা টিকে আছে ক্রান্তি ব্লকে। কিন্তু সেখানেও যদি মেহবুব বা মহাদেবের অভিমানী রাজনীতি প্রভাব ফেলে, তবে মাল বিধানসভার ফলাফল হবে এক বড় রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি।
