একটা আইফোনের কিস্তির জন্য ঝাঁপ। ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে বাবার মৃত্যু। দুজনকেই মরতে দেখে সহমরণে মা-ও। মহারাষ্ট্রের এই ঘটনা শিখিয়ে গেল অনেক কিছু।
দীপ সাহা
মহারাষ্ট্রের তিসগাঁও এলাকার খাভদ্যা পাহাড়। সেখানে এক চূড়ায় দাঁড়িয়ে বছর আঠারোর কুণাল ছাঙ্গুডে। নীচে গভীর খাদ। কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে তাঁর বাবা-মা। তাঁরা ছেলেকে বোঝাচ্ছেন। বারবার বলছেন ফিরে আসতে। স্থানীয়রাও জড়ো হয়েছেন। পুলিশ এসেছে। সবাই চেষ্টা করছেন। কিন্তু কুণাল নীচে নামতে রাজি নন।
ঝামেলার সূত্রপাত একটা আইফোন নিয়ে। ফোনটা কেনা হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু সমস্যা বাধে কিস্তি দেওয়া নিয়ে। কিস্তির টাকা দিতে অস্বীকার করায় বাবা-মায়ের সঙ্গে কথাকাটাকাটি হয় সদ্য তারুণ্যে পা রাখা কুণালের। তারপর রাগ, অভিমান। সোজা চলে যান পাহাড়ের মাথায়। সকাল গড়িয়ে দুপুর। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাচ্ছে। গ্রামের প্রধান, পড়শি- কেউ তাঁকে বোঝাতে পারছেন না।
এমন সময় বাবা ছেলের দিকে এগিয়ে গেলেন। উদ্দেশ্য একটাই, ছেলেকে যে করে হোক বাঁচানো। কিন্তু সেই চেষ্টা সফল হল না। বাবা ও ছেলে দুজনেই খাদে পড়ে গেলেন। আর স্বামী ও সন্তানকে চোখের সামনে হারিয়ে মা-ও শেষপর্যন্ত ঝাঁপ দিলেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে গেল তিন-তিনটে প্রাণ। একটা গোটা পরিবার (Maharashtra Household Tragedy)।
ঘটনাটা জেনে প্রথমেই প্রশ্ন জাগে, একটা আইফোনের জন্য কেউ কি সত্যিই জীবন দিয়ে দিতে পারে?
সম্ভবত ফোনটা আসল কারণ নয়। ফোনটা ছিল সামনে থাকা কারণ। তার পেছনে ছিল আরও অনেক কিছু। অভিমান, রাগ, নিজের ইচ্ছা পূরণ না হওয়ার কষ্ট, অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করা, আর সবচেয়ে বড় কথা, সেই মুহূর্তে নিজের আবেগকে সামলে উঠতে না পারা। ১৮ বছর বয়সে একটা ছেলে আইফোনের কিস্তির জন্য এমন চরম সিদ্ধান্ত নেবে, বিষয়টা এত সহজ নয়। ঘটনাটা তাই শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, আমাদের পরিবারগুলোর ভেতরের একটা বড় সমস্যার দিকেও আঙুল তুলে দেয়।
সপ্তাহদুয়েক আগে মালবাজারের কাছে সোনগাছি চা বাগানেও ১৬ বছরের এক কিশোর আত্মহননের পথ বেছে নেয়। কারণ? পরিবারের কাছে সে একটা বাইক কিনে দেওয়ার দাবি রেখেছিল। কিন্তু বাবা তাতে রাজি হননি। এমন ঘটনা আমাদের চারপাশে আকছার ঘটে এবং ঘটছেও।
উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ উত্তম মজুমদার সেই রেশ টেনেই বলছেন, ‘আমাদের দেশে পেরেন্টাল কাউন্সেলিংয়ের অভাব একটা বড় সমস্যা। বিদেশে সন্তান লালনপালনের ক্ষেত্রে পেরেন্টাল কাউন্সেলিংকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কোনটি সন্তানকে দেওয়া উচিত, কোনটি দেওয়া উচিত নয়, সেটা বাবা-মায়ের বোঝা দরকার। আর এই অভ্যাসটা সন্তান ছোট থাকতেই শুরু হওয়া উচিত।’
কথাটা খুব সহজ। কিন্তু আমরা কি সেটা করি?
বরং অনেকসময় সন্তানের প্রয়োজন হওয়ার আগেই তার চাহিদা পূরণ করে ফেলি। সন্তানের খিদে পাওয়ার আগেই খাবার তৈরি। বায়না করার আগেই খেলনা। প্রয়োজন হওয়ার আগেই ফোন। কারণ বাবা-মা চান, তাঁদের সন্তান যেন কোনওদিক থেকে পিছিয়ে না থাকে। অন্য বাচ্চার কাছে যা আছে, নিজের সন্তানের কাছেও যেন তা থাকে।
মনোবিদ শর্মিষ্ঠা পালও কিন্তু সেই যুক্তিই টেনে আনছেন। তাঁর কথায়, ‘মহারাষ্ট্রের এই ঘটনা আমাদের সমাজেরই প্রতিচ্ছবি।’ তাঁর মতে, ১৮ বছরের একটা ছেলে আইফোনের কিস্তির জন্য এমন চরম সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, এটা একদিনে তৈরি হওয়া ঘটনা নয়। এর পেছনে অনেকদিনের একটা মানসিকতা কাজ করতে পারে।
একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই। আগেকার দিনে বাড়ির ঠাকুমা-দিদারা বলতেন, সন্তান খিদের জন্য কান্না না করা পর্যন্ত যেন তার মুখে খাবার তুলে দেওয়া না হয়। কথাটার মধ্যে একটা শিক্ষা ছিল, প্রয়োজনটা বুঝতে শেখো। এখন অনেক ক্ষেত্রে উলটো ছবি। সন্তানের খিদে পাওয়ার আগেই খাবার সামনে। চাওয়ার আগেই খেলনা।
কেন?
কারণ, একটা ভয় কাজ করে। আমার সন্তান যেন অন্যদের থেকে পিছিয়ে না পড়ে। অন্য বাচ্চার কাছে এটা আছে, আমার সন্তানের কাছে নেই। এই ধরনের হীনম্মন্যতা থেকেই অনেক বাবা-মা প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিনিস কিনে দেন। সেখানেই ধীরে ধীরে একটা অভ্যাস তৈরি হয়। সন্তান শিখে যায়, ‘আমি চাইলে বাবা-মা কোনও না কোনওভাবে সেটা এনে দেবেন।’ আর বাবা-মাও অভ্যস্ত হয়ে যান সন্তানের বায়না মেটাতে। তারপর একদিন সত্যিই ‘না’ বলতে হলে সমস্যা তৈরি হয়।
কুণালের ঘটনাটাও হয়তো তাই। নইলে আঠারো বছরের একটা ছেলে কেনই-বা পরিবারের আর্থিক ক্ষমতার বাইরে গিয়ে একটা আইফোন কিনবে? কেনই-বা সেই কিস্তি মেটানোর জন্য বাবা-মাকে ব্ল্যাকমেল করবে?
ডাঃ মজুমদার বাবা-মায়েদের আরও একটি বিষয়ে সতর্ক করছেন। তাঁর ব্যাখ্যা, সন্তান শুধু বাবা-মায়ের কথা শুনে শেখে না, তাঁদের কাজ দেখেও শেখে। বাবা যদি প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও দামি ফোন কেনেন, দামি গাড়ি কেনেন, নতুন জিনিস কেনার ব্যাপারে কোনও সংযম না দেখান, সন্তানও সেই জীবনযাপন দেখেই বড় হয়। সে বুঝে নেয়, দামি কিছু চাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
এই শিক্ষা খুব ধীরে ধীরে তৈরি হয়। বাবা-মা সন্তানকে যদি মুখে নাও বলেন, ‘তুই যা চাইবি, আমরা কিনে দেব’, তবু সে বুঝে যায় ‘চাইলে তো পাবই’। আজ একটা খেলনা। কাল একটা ফোন। পরশু একটা বাইক। তারপর আরও কিছু। প্রতিবারই যদি ‘না’ বলার বদলে কোনওভাবে ‘হ্যাঁ’ বলা হয়, তাহলে সন্তান ‘না’ শব্দটার সঙ্গে পরিচিতই হয় না।
কিন্তু জীবন তো সবসময় ‘হ্যাঁ’ বলে না।
বন্ধুর কাছে নতুন আইফোন থাকবে, নিজের কাছে থাকবে না। বন্ধুর নতুন বাইক থাকবে, নিজের থাকবে না। কেউ বিদেশে ঘুরতে যাবে। সবটা তো আর সবার পক্ষে সম্ভব নয়। এই না-পাওয়াগুলো সামলানোর ক্ষমতা ছোটবেলা থেকেই তৈরি করতে হয়। আর সেটা তৈরি করার দায়িত্ব শুধু স্কুলের নয়, বাবা-মায়েরও।
সন্তানকে ভালোবাসার অর্থ তার প্রতিটি চাওয়া পূরণ করা নয়। বরং কখন কোথায় ‘না’ বলতে হবে, সেটাও ভালোবাসার অংশ। সবচেয়ে বেশি শেখাতে হয়, কোনও একটা জিনিস না পাওয়া মানে জীবন শেষ নয়।
মহারাষ্ট্রের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে কুণাল হয়তো সেই মুহূর্তে এই কথাটা ভাবতে পারেননি। তাঁর কাছে তখন সমস্যাটা হয়তো বিশাল হয়ে উঠেছিল।
এখন এই ঘটনাকে দেখে ‘আজকালকার ছেলেমেয়েরা এমনই’ বলে দায় সেরে ফেলা খুব সহজ। কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং আমাদের নিজেদেরও প্রশ্ন করতে হবে, আমরা কি সন্তানকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দিচ্ছি? সবচেয়ে বড় কথা, আমরা কি তাকে ‘না’ শুনতে শেখাচ্ছি?
কারণ সন্তানকে সবকিছু দেওয়া যায় না। সবকিছু দেওয়া উচিতও নয়। কিন্তু একটা বিশ্বাস অবশ্যই দিতে হয় যে, ‘তুই যা-ই চাস, আমরা সবসময় দিতে পারব না। কিন্তু তুই যতই রাগ করিস, যতই ভুল করিস, আমাদের কাছে ফিরে আসার দরজা সবসময় খোলা।’
হয়তো একটা আইফোনের চেয়েও এই বিশ্বাসটা অনেক বেশি দামি।

