সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, ডালাস: ২০১৬ সালের সেই অভিশপ্ত রাতের কথা মনে পড়ে? চিলির কাছে কোপা আমেরিকার ফাইনালে পেনাল্টি ফস্কে তীব্র যন্ত্রণায় বিদ্ধ হয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘জাতীয় দলের অধ্যায় আমার জন্য শেষ। আমি চ্যাম্পিয়ন হতে পারলাম না।’ সেই চরম হতাশার ঠিক দশ বছর পর, ৩৯তম জন্মদিনের (Lionel Messi thirty ninth Birthday) ঠিক পূর্বক্ষণে দাঁড়িয়ে ডালাসের এটি অ্যান্ড টি স্টেডিয়ামের সেই জাদুকরী প্রহরটার দিকে ফিরে তাকালে মনে হয়, এ কোনও রক্তমাংসের মানুষের গল্প নয়, বরং এক মহাকাব্যিক অমরত্ব। কাকতালীয়ভাবে ডালাসের ম্যাজিকের দিনটা ছিল ২২ জুন। ঠিক চল্লিশ বছর আগে যেদিন দিয়েগো মারাদোনার ‘হ্যান্ড অফ গড’ বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছিল। আর চার দশক পর সেই একই দিনে লিওনেল মেসি নামের এক জাদুকর ফুটবল ইতিহাসের সমস্ত রেকর্ড বই নতুন করে লিখে নিজের জন্মদিনের শ্রেষ্ঠ উপহারটি বিশ্বকে আগাম দিয়ে রাখলেন।
অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে মহারণের শুরুতেই পেনাল্টি ফস্কে যাওয়ায় ডালাসের গ্যালারিতে যে বুকচেরা নৈঃশব্দ্য নেমে এসেছিল, তা আসলে ছিল এক ঐশ্বরিক চিত্রনাট্যের নিপুণ পূর্বাভাস। লাতিন আমেরিকান ফুটবল বিশেষজ্ঞ টিম ভিকারি যেমনটা জানিয়েছিলেন, ফুটবল-বিধাতা হয়তো চাননি যে মেসি একটা সাদামাটা পেনাল্টি দিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়ুক। তাঁর জন্য বরাদ্দ ছিল এক জাদুকরী লগ্ন। আর হলও ঠিক তাই। প্রথমার্ধে সেই নিখুঁত রাজকীয় ভলি এবং ইনজুরি টাইমে দুরূহ কোণ থেকে অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় করা জোড়া গোল যেন প্রমাণ করে দিল, বয়স তাঁর কাছে নিছকই ক্যালেন্ডারের পাতায় আটকে থাকা এক তুচ্ছ সংখ্যা। এই জোড়া গোলের সুবাদেই মিরোস্লাভ ক্লোসেকে টপকে ১৮টি গোল নিয়ে তিনি এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকালের সর্বাধিক গোলস্কোরার। শুধু তাই নয়, জঁা ফঁতে ও জাইরজিনহোর পর ইতিহাসের তৃতীয় ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপে টানা ছয়টি ম্যাচে গোল করার বিরল নজিরও গড়লেন তিনি। সবচেয়ে বিস্ময়কর হল, তাঁর এই ১৮টি গোলের মধ্যে ১২টিই এসেছে ৩৫ বছর বয়স পেরোনোর পর!
ডালাসের প্রেস বক্সে বসে চোখের সামনে ফুটবল বিশ্বের রথী-মহারথীদের এই মহাতারকার প্রতি যে অকুণ্ঠ মুগ্ধতা দেখলাম, তা আক্ষরিক অর্থেই অভূতপূর্ব। ইংল্যান্ডের প্রাক্তন স্ট্রাইকার ক্রিস সাটনের চোখে মেসি যেন সবুজ গালিচায় অন্য সবার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক খেলায় মগ্ন। যেখানে তাঁর দূরদর্শিতা আর বুদ্ধিমত্তা সাধারণের ধরাছোঁয়ার অনেক বাইরে। ফরাসি কিংবদন্তি অলিভার জিরুর কথাগুলি তো আরও রোমাঞ্চকর। তিনি বলছিলেন, ‘আর্জেন্টিনার প্রতিটি ফুটবলার মাঠে বল পেয়ে শুধুই জাদুকরকে খোঁজে। টানা দুইটি বিশ্বকাপ জেতার এই অদম্য বাসনায় ওরা হাসিমুখে মাঠে মেসির জন্য প্রাণ বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত!’ ৩৯তম জন্মদিনের এই শুভলগ্নে দাঁড়িয়ে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার বা হুলিয়ান আলভারেজদের মতো সতীর্থদের ঘোর যেন কিছুতেই কাটতে চাইছে না। অ্যালিস্টারের কথায়, ‘মাঠে ওর পাশে দাঁড়িয়ে ওই ঐশ্বরিক ম্যাজিক চোখের সামনে দেখাটা আক্ষরিক অর্থেই একটা পরম স্বপ্নের মতো।’
স্প্যানিশ সাংবাদিক গিলেম বালেগের ভাষায়, এই মুহূর্তে মেসির জন্য নতুন করে কোনও মূর্তি গড়ার বা খবরের কাগজে বসে গভীর বিশ্লেষণ করার সময় আমাদের নেই, কারণ ওর এই অবিশ্বাস্য গতির সঙ্গে আমরা পাল্লা দিতে অপারগ। পেশিশক্তির চেয়ে নিজের ক্ষুরধার মস্তিষ্ককে কাজে লাগিয়েই সময়ের চাকাকে হার মানাচ্ছেন তিনি। পেনাল্টি মিসের সেই তীব্র হতাশা থেকে জোড়া গোলের এই ঐশ্বরিক প্রত্যাবর্তনই বুঝিয়ে দেয়, মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি এক জীবন্ত শিল্প। বুধবার যখন তিনি ৩৯ বছরে পা দেবেন, তখন গোটা ফুটবল বিশ্ব তাঁর সামনে নতজানু হয়ে থাকবে। রবিবার জর্ডনের বিরুদ্ধে তিনি হয়তো রেকর্ডের পাতা নতুন করে সাজাবেন, তবে জন্মদিনের এই পবিত্র ক্ষণে দাঁড়িয়ে এটুকু অনায়াসেই বলা যায়-লিওনেল মেসি, তুমিই ফুটবল-বিধাতার শ্রেষ্ঠ সন্তান, তুমিই সর্বকালের সেরা। শুভ জন্মদিন, জাদুকর!

