উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: শনিবারের যুবভারতীর লজ্জাজনক ঘটনাকে কেন্দ্র করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সুর বদলাল শাসক দল। প্রথমে নিজেদের ‘মর্মাহত’ বলে দাবি করা হলেও, পরে তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষের গলায় শোনা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর। একদিকে ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসকে ‘ক্লিনচিট’ দেওয়া হলো, অন্যদিকে দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভের পেছনে হঠাৎ করেই খুঁজে পাওয়া গেল ‘বিজেপি-র ষড়যন্ত্র’! রাজনৈতিক মহলের মতে, মেসি-কাণ্ডে (Lionel Messi) নিজেদের পিঠ বাঁচাতে এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা ঢাকতে এবার ‘শকুনের রাজনীতি’র তত্ত্ব খাড়া করছে তৃণমূল।
শনিবারের বিশৃঙ্খলার পর আঙুল উঠছিল স্টেডিয়ামে উপস্থিত ভিআইপি এবং মন্ত্রীদের অতি উৎসাহের দিকে। কিন্তু শিগগিরই কুণাল ঘোষ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “অরূপ বিশ্বাস ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে আমন্ত্রিত ছিলেন। তাঁর উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনও অবকাশ নেই।” অথচ গ্যালারিতে থাকা দর্শকরা কিন্তু এই অভিযোগই করে গিয়েছেন যে, মন্ত্রীদের ভিড়েই মেসিকে দেখা যায়নি। সাধারণ মানুষের সেই অভিযোগকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে তৃণমূল এখন মন্ত্রীকে আড়াল করতে ব্যস্ত। প্রশ্ন উঠছে, মন্ত্রী যদি শুধু আমন্ত্রিতই হবেন, তবে নিরাপত্তার ঘেরাটোপ ভেঙে মেসিকে সর্বক্ষণ ঘিরে থাকার ‘সৌজন্য’ কেন দেখালেন?
সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, ঘটনার দায়ভার অন্যের ঘাড়ে চাপানোর কৌশল। কুণাল ঘোষ দাবি করেছেন, “রাজ্য সরকারের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই। এটি সম্পূর্ণভাবে আয়োজকদের ব্যর্থতা।” সরকার নাকি অনুমতি দিতে বাধ্য ছিল, না দিলে ‘বাংলা-বিরোধীরা’ গেল গেল রব তুলত। কিন্তু একটি ফিফা-স্বীকৃত স্টেডিয়ামে, পুলিশ ও প্রশাসনের নাকের ডগায়, হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে আয়োজিত এমন একটি হাই-প্রোফাইল ইভেন্টে সরকার কি শুধুই দর্শক? অনুমতি দেওয়ার পর কি প্রশাসনের আর কোনও দায় থাকে না?
তৃণমূলের ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ এখানেই থেমে থাকেনি। কুণাল ঘোষের দাবি, মাঠের অশান্তি আসলে দর্শকদের ক্ষোভ নয়, বরং “বিজেপি-সমর্থিত দুষ্কৃতীদের উসকানি।” তাঁর অভিযোগ, গেরুয়া পতাকা নিয়ে দুষ্কৃতীরা মাঠে ঢুকেছিল এবং ‘শকুনের রাজনীতি’ করে বাংলার বদনাম করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—যেখানে হাজার হাজার টাকার টিকিট কেটে ঢুকতে হয়েছে, যেখানে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী ছিল, সেখানে ‘গেরুয়া পতাকা’ হাতে দুষ্কৃতীরা ঢুকল কী করে? পুলিশ তখন কী করছিল? ক্ষুব্ধ ফুটবলপ্রেমীদের আবেগকে ‘বিজেপি-র গুন্ডামি’ বলে দাগিয়ে দেওয়া কি আসলে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকারই এক মরিয়া চেষ্টা নয়?
মুখ্যমন্ত্রী তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন ঠিকই, কিন্তু দলের মুখপাত্র যখন আগেই রায় দিয়ে দেন যে, ‘সরকারের দোষ নেই’ এবং ‘সব দোষ বিজেপি-র’, তখন সেই তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আয়োজক সংস্থাকে ‘অপদার্থ’ বলে তাদের ওপর সব দায় চাপিয়ে, আর বিরোধীদের দিকে আঙুল তুলে সরকার হয়তো সাময়িক স্বস্তি খুঁজছে, কিন্তু বাস্তব হলো, কলকাতার ফুটবলপ্রেমীরা প্রতারিত হয়েছেন। আর সেই প্রতারণার দায় এড়াতে এখন চলছে নগ্ন রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুড়ি। মেসির কলকাতা সফর এখন আর ফুটবলের উৎসব নয়, বরং শাসক দলের ‘আত্মপক্ষ সমর্থনের’ এক করুণ নাটক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
