রূপায়ণ ভট্টাচার্য
ইন্ডিগো থেকে এক পলকে ‘ইন্ডিনোগো’ হয়ে ওঠা বিমান কোম্পানিকে একদিক দিয়ে ধন্যবাদ। তারা আমাদের বুঝিয়ে দিয়ে গেল ভারতে মোনোপলি বা ডুওপলির ব্যবসা কী ভয়ংকর জায়গায় যেতে পারে।
রাতারাতি কীভাবে তারা হাজার হাজার মানুষকে অসহায় করে দিয়ে যেতে পারে। অনেকটা ব্যাংক ফেল করার মতো ব্যাপার।
দিন সাতেক আগেও ভারতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এয়ারলাইন্স ছিল ইন্ডিগো। চোখ বন্ধ করে টিকিট কেটে ফেলা যেত এই এয়ারলাইন্সের। পাইলট যখন গন্তব্যস্থলে নামছেন, তখন গর্ব করে বলতেন, ‘এটা ইন্ডিগো টাইম। আমরা অমুক মিনিট আগে পৌঁছে গিয়েছি নির্ধারিত সময়ের।’
সেই সুনাম আজ চুরমার। মুন্নি বদনাম হুই। পেছনে যেন দাবাং সিনেমার গান বাজছে। নাচছেন সলমন খান, মালাইকা অরোরা ও সোনু সুদ।
বিমানযাত্রা এখন আর শুধুই অভিজাতদের জন্য নয় আগের মতো। আজকাল প্রচুর সাধারণ মানুষ বিমানে যাতায়াত করেন। সেখানে ইন্ডিগোর সাম্প্রতিক কেলেঙ্কারি ভারতীয় সমাজে ভয়ংকর ছাপ ফেলে দিয়ে গেল। আমরা বুঝলাম, কোনও বিশেষ ইন্ডাস্ট্রিতে একটা বা দুটো সংস্থার দাদাগিরি চললে কী দুর্দশার মধ্যে পড়তে পারে দেশ।
ইন্ডিগো এয়ারক্র্যাফটের সংখ্যা যেখানে ৪১৭, সেখানে বাকি চারটি সংস্থার মোট এয়ারক্র্যাফটের সংখ্যাই অত নয়। এয়ার ইন্ডিয়া ১৮৭, এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস ১১৫, স্পাইসজেট ৩৫, আকাশা ৩০। প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতটা ছেলেখেলা, বোঝা যাবে এই পরিসংখ্যান থেকে।
আরও অবিশ্বাস্য সংখ্যার খেলা রয়েছে। ইন্ডিগো স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার দিন কলকাতা-বেঙ্গালুরু ফ্লাইটের ভাড়া ৮ হাজার থেকে হয়ে দাঁড়ায় এক লক্ষ। নয়াদিল্লি-কলকাতা ৭ হাজারের বদলে উঠল ৮৪ হাজার। মুম্বই-কলকাতা ছিল ৮ হাজার, হয়ে গেল ৪৮০০০। কেন্দ্রীয় সরকার দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। আমাদের ভয় করতে লাগল বিমান সংস্থায় মোনোপলি যদি এরকম ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি করে, ভবিষ্যতে আমাদের দেশে কী হবে অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রিতে?
সামান্য একটু চিন্তা করে বেশ কিছু শিল্পে দেখি দুটো সংস্থার রমরমা। মানে সেখানে একটা সংস্থায় গণ্ডগোল হলেই পুরো দেশ সংকটে পড়ে যেতে পারে। এখন দেখুন না, যদি ফেসবুক, ইনস্টা বা ইউটিউব হঠাৎ ঘোষণা করে দেয়, তারা আর কোনও পোস্টকে টাকা দেবে না, এখন কী হবে ভারতের? লক্ষ লক্ষ লোক কার্যত বেকার হয়ে যাবেন! ধাক্কা খাবে দেশের অর্থনীতিও। এআই নির্ভরতাও অনেকটা একই ধরনের সংশয়ের জন্ম দেয়।
মোনোপলির কথা বললে এক ঝলকে ভারতের যে ক’টা ইন্ডাস্ট্রির কথা মনে পড়ে, তা তো হাতের কড় ছাপিয়ে যায়। টেলিফোন ইন্ডাস্ট্রিতে যেমন এয়ারটেল এবং জিও অর্ধেকের বেশি বাজার দখল করে রেখেছে। একটা নেটওয়ার্ক খারাপ হলেই বহু লোকের মাথায় হাত পড়বে। ট্যাক্সি সার্ভিসে উবর এবং ওলা, ফুড ডেলিভারিতে জোম্যাটো ও সুইগি, এডটেকে বাইজু এবং আনএকাডেমি। সুপার মার্কেটে রিলায়েন্স রিটেল আর ডিমার্ট, ই কমার্সে অ্যামাজন ও ফ্লিপকার্ট। ঠান্ডা পানীয়তে কোক এবং পেপসি, যা ডুয়াল মোনোপলির আদর্শ উদাহরণ। মোবাইল অপারেটিং সিস্টেমে আছে অ্যানড্রয়েড এবং আইওএস।
এবারে ভেবে দেখুন, এগুলোর মধ্যে যে কোনও একটা কয়েকদিনের জন্য বন্ধ হলে দেশের মানুষের কীরকম পরিস্থিতি হবে। ইন্ডিগো কার্যত স্তব্ধ হওয়ার পর একটি ভাইরাল পোস্টে দেখলাম এক ফরাসি নাগরিক ইন্ডিগো কাউন্টারের সামনে উঠে চিৎকার করছেন এবং নাচছেন। নিজস্ব ভাষায় ক্ষোভ জানাচ্ছেন সামনে সমবেত জনতাকে। এটা কি আমাদের দেশের পক্ষে খুব ভালো সংকেত গেল গোটা পৃথিবীর কাছে?
ডুওপলি ও মোনোপলির ক্ষেত্রে দুটো জিনিস দেখা যাচ্ছে বারবার। এক নম্বর বা দু’নম্বর সংস্থা বাকি প্রতিযোগীদের গ্রাস করে ফেলার জন্য কিনেই ফেলছে। দ্বিতীয়ত, বাজার বাড়ানোর জন্য অহেতুক খরচ করে লোক দেখাতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনছে নিজেরাই।
প্রথম ক্ষেত্রে ভারতে উদাহরণ আদানি এবং আম্বানিদের নানা ‘রাজকর্ম’। বিনোদন জগতে আম্বানি প্রথমে নিলেন ডিজনি। পাশাপাশি স্টার প্লাস চ্যানেলের সঙ্গে কিনে ফেলেছেন তাদের প্রতিপক্ষ কালার্সও। কাগজের ভাষায় যৌথ বাণিজ্য।
দ্বিতীয় ক্ষেত্রে উদাহরণ হতে পারে, ইন্ডিগো। দেশে-বিদেশে তারা রুট বাড়িয়েছে প্রচুর। যতটা বাড়ানো সম্ভব তার থেকেও বেশি বাড়িয়ে ফেলেছে। তারপর আর সামলাতে পারছে না। কমে গিয়েছে পাইলটের সংখ্যা, কমে গিয়েছে এয়ার হোস্টেসদের সংখ্যা। এয়ার হোস্টেসদের বেতন কম করে বা পাইলটদের কাজের সময় বাড়িয়েও পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না।
আমরা চোখের সামনে দেখেছি ঝকঝকে তকতকে জেট এয়ারলাইন্স, সাহারা, কিংফিশার ও ডেকান এয়ার রাতারাতি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। স্বপ্নেও যা ভাবা যায়নি কখনও। বিশেষ করে জেট এয়ারলাইন্স, একটা সময় তারাই ছিল দেশের এক নম্বর। বিজয় মাল্যর কিংফিশার আবার চোখধাঁধানো কাজকর্মে বিশ্বাস করত। আরেক চোখধাঁধানো এয়ারলাইন্স ভিস্তারা শুরু হয়েছিল টাটা ও সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের যৌথ উদ্যোগে। তেরো মাস আগে মিশে গিয়েছে এয়ার ইন্ডিয়ার সঙ্গে। এয়ার এশিয়া ইন্ডিয়া যেমন এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসের সঙ্গে মিশে গিয়েছে।
তার মানে একেবারে আনকোরা কেউ টিকে থাকতে পারছে না। সোজা বাংলায় দাদা ধরছে। আর আমরা এসব দেখে আরও ঘাবড়ে যাচ্ছি। ঘরপোড়া গোরু যেমন সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়।
রিজার্ভ ব্যাংকের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন একবার বলেছিলেন ‘মোনোপলিস্টরা সব সময় তাঁদের মোনোপলিকে সমর্থন করেন একটা কথা বলে। প্রতিযোগিতা সব সময় অর্থহীন।’ আমাদের দেশেই অনেক সেক্টরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। সেখানে কেমন কাজ চলছে তা যাচাই করার ভার রইল পাঠকের উপরে।
উদাহরণ চাই? আইআরসিটিসি ১০০ ভাগ, হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স ১০০ ভাগ, কোল ইন্ডিয়া ৮২ ভাগ, আইটিসি ৭৭ ভাগ। অন্তত রেল কীভাবে চলে, এই অভিজ্ঞতা তো সবারই রয়েছে। তবে ভারতে এত ট্রেন চলে, এত রেললাইন, সেখানে বেসরকারি উদ্যোগ ঢুকে পড়া একটু মুশকিলই। ইউরোপে যেটা সম্ভব, সেটা ভারতে সম্ভব নয়। রেলে অনেক রুটই লাভজনক নয় কিন্তু চালাতে হয় সরকারকে। বেসরকারি সংস্থার পক্ষে সেটা করা সম্ভব হবে না।
মোনোপলির তিনটি সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক কী কী? এক, জিনিসের দাম অনেক বেশি হয়ে যায়। দুই, উৎপাদক সংস্থা নতুন নতুন দিক দেখায় না ক্রেতাদের। ক্রেতাদের হাতেও বিকল্প থাকে না বেশি। তিন, কোনও জিনিস ভালো না লাগলেও সেটা কিনতেই হয়।
মোনোপলি বন্ধে কেন্দ্রীয় সরকার ২০০২ সালে একটি কম্পিটিশন অ্যাক্ট চালু করেছিল। দেশে কম্পিটিশন কমিশন অফ ইন্ডিয়া বলে একটি কমিশনও রয়েছে। করে কোনও লাভ হয়েছে, কতটা লাভ হয়েছে, এসব নিয়ে চর্চা হতেই পারে। তবে এখানেই উঠে আসবে বিশ্বজুড়ে মোনোপলি বা ডুওপলির অতি চেনা কিছু উদাহরণ।
লিখতে গিয়ে দেখবেন, সবই তো আসলে ঘরের জিনিস। প্রতিদিন কাজে লাগে। প্রতিদিন আমরা নিজেদের সমর্পণ করে দিই মনোপলির মহা সম্রাটদের কাছে। একেবারে অজান্তেই হয়তো এদের না হলে অনর্থক জীবন।
নামগুলো লিখি। উইন্ডোজের মাইক্রোসফট, সার্চ ইঞ্জিনে গুগল, ই কমার্সে অ্যামাজন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ফেসবুক, সিপিইউতে ইন্টেল, পেমেন্টে ভিসা বা মাস্টার কার্ড, ওষুধপত্রে ফাইজার–এরাও তো এক একটা আমাদের ইন্ডিগোর মতো। আজ যদি একটা ভিসা বা মাস্টার কার্ড, ফাইজার, মাইক্রোসফট, গুগল অকেজো হয়ে পড়ে, পৃথিবীও তো অচল হয়ে পড়বে।
দোষটা এই কোম্পানিগুলোর নয়, বরং কৃতিত্বই এদের। এরা এমন উচ্চতায় নিজেদের নিয়ে গিয়েছে, না থাকলে পৃথিবী স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়বে। এদের বিকল্প অন্য কেউ হতে পারেনি এতদিনেও। দোষটা তো মাইক্রোসফট বা মাস্টার কার্ডের নয়।
ওরকম যুক্তির আয়নায় ইন্ডিগোর সাম্প্রতিক কেলেঙ্কারিতে তাদের দোষ ধরতে গেলে ওদের আর কোনও দোষ পাবেন না। প্রশ্নটা তখন অন্য হয়ে দাঁড়াবে। কেন আরও একটা ইন্ডিগো তৈরি করতে পারেনি ভারত?
The submit ইন্ডিনোগো : মোনোপলির মাৎস্যন্যায় appeared first on Uttarbanga Sambad.
