সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, নিউ জার্সি: কোথাও যেন একটা কাব্যিক শান্তি নেমে এসেছে তাঁর জীবনে। কোপা আমেরিকা (Copa America) থেকে বিশ্বকাপ-ফুটবল ঈশ্বর নিজের বরপুত্রের হাতে শংসাপত্র তুলে দিয়ে বোধহয় নিজেও নিশ্চিন্ত হয়েছেন। নাহলে যে রোজ তাঁরই বরপুত্রকে ক্ষতবিক্ষত হতে দেখতে হত! সেই শংসাপত্রের জোরেই এখন লিওনেল মেসি (Lionel Messi) তো বটেই, তাঁর সতীর্থ থেকে শুরু করে আমজনতার আত্মবিশ্বাস একেবারে তুঙ্গে। মায়ামির ক্রিশ্চিয়ান ব্লাঙ্কো কিংবা আগের দিন ব্রাজিল-মরক্কো ম্যাচের গ্যালারিতে বসা দিয়েগোদের গলায় তাই একই সুর-‘এবারও কাপটা আমাদেরই।’
কিন্তু এই আত্মবিশ্বাসের উৎস কোথায়? একটা অবশ্যই কাতার, আর অন্যটা মায়ামি। পাঁচ-পাঁচটা বিশ্বকাপ খেলার পর, কাতারের প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে মুখ থুবড়ে পড়ার পর যে মানুষটা হয়তো বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন ‘আর হল না’, সেখান থেকেই ফিনিক্স পাখির মতো উত্থান। ফুটবল ঈশ্বর জানতেন, এই মানুষটাকে এবার একটু আপাত শান্ত, চাহিদাহীন পরিবেশ দিতে হবে। ঠিক সেই সময়েই বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেন ডেভিড বেকহ্যাম। প্যারিস সাঁ জাঁ-র সংসারে যখন রোজ অশান্তির আগুনে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছিলেন মেসি, তখন বেকহ্যাম বুঝেছিলেন, রোজ পরীক্ষা দিতে হলে এই মহাতারকা আর টানতে পারবেন না। তাই মায়ামির আদরের আশ্রয়ে তাঁকে নিয়ে আসা। এখানে তিনি শুধুই ফুটবলের আনন্দে মাতোয়ারা, কোনও বাড়তি চাপের বোঝা নেই। আর ঈশ্বর খোশমেজাজে থাকলে, তাঁর হয়ে বাকি কাজ রডরিগো ডি পল, এমিলিয়ানো মার্টিনেজ বা হুলিয়ান আলভারেজরাই হাসিমুখে করে দেন।
মঙ্গলবার কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে আলজিরিয়ার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করছে আর্জেন্টিনা (Argentina)। প্রস্তুতি ম্যাচে মেসিকে যে ফুরফুরে মেজাজে দেখা গিয়েছে, তাতে শুরু থেকেই তাঁর মাঠে নামার সম্ভাবনা প্রবল। সুখবর হল, আঙুলের চোট সারিয়ে এমিলিয়ানোও প্রথম একাদশে ফিরছেন। নিকোলাস ট্যাগলিয়াফিকো ফিট হয়ে গেলে কোচ লিওনেল স্কালোনি (Lionel Scaloni) হয়তো গত বিশ্বকাপ ফাইনালের সেই এগারোজনকেই নামিয়ে দেবেন। স্কালোনির সবচেয়ে বড় গুণ হল তাঁর নীরবতা। প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকা এই প্রাজ্ঞ কোচ কোনও প্রতিপক্ষকেই বাড়তি কথা বলে ফোকাস নষ্ট করার সুযোগ দেন না।
তবে আলজিরিয়াকে হালকাভাবে নিলে যে সমূহ বিপদ, তা ড্র হওয়ার পর থেকেই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। টানা চার ম্যাচ অপরাজিত তারা, যার মধ্যে নেদারল্যান্ডসকে হারানো এবং উরুগুয়ের সঙ্গে ড্র করার মতো কীর্তি রয়েছে। কোচ ভ্লাদিমির পেটকোভিচকে ২০২৮ পর্যন্ত চুক্তিবদ্ধ করেছে আলজিরিয়ার ফুটবল সংস্থা। দলের দুই স্ট্রাইকার হাদজ মৌসা ও আমিনে গৌইরি দুরন্ত ছন্দে রয়েছেন। তবে তাদের আসল তুরুপের তাস হলেন ইব্রাহিম মাজা (Ibrahim Maza), যাঁর পরিচিত নাম ‘মাজাদোনা’ বা আফ্রিকার মারাদোনা। আত্মবিশ্বাসী এই তরুণ প্লে-মেকার আর্জেন্টিনাকে হারানোর ব্যাপারে রীতিমতো হুংকার ছেড়ে রেখেছেন।
অবশ্য বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের অধিনায়কও ছেড়ে কথা বলার পাত্র নন। তিনি নিঃশব্দে বার্তা দিয়ে রেখেছেন, ‘আমাদের প্রতিপক্ষ বুঝবে আর্জেন্টিনা কী কঠিন ঠাঁই!’ কানসাস সিটির সবুজ গালিচায় এখন কেবল বল গড়ানোর অপেক্ষা।
