সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, নিউ জার্সি: ভারতবর্ষের ফুটবল নিয়ে যত কম কথা বলা যায়, ততই বোধহয় ভালো। আমাদের দেশের বহু মানুষের আক্ষেপ-কুরাসাও বা আইভরি কোস্টের মতো দেশগুলি পারলে আমরা কেন পারি না? এই ব্যর্থতার জন্য স্বভাবতই কর্তাদের মুণ্ডপাত করা হয়, যার সিংহভাগই হয়তো সত্যি। কিন্তু যুগ যুগ ধরে ভারতীয় ফুটবলাররাও কি নিজেদের দায় এড়াতে পারেন? তাঁরা নিজেদের সময়ে যে পরিমাণ অর্থ উপার্জন করেন, আন্তর্জাতিক মাপকাঠিতেও তা নেহাত কম নয়। সুনীল ছেত্রী (Sunil Chhetri) বা ভাইচুং ভুটিয়ারা (Bhaichung Bhutia) ভারতীয় ফুটবলে যে স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে জন্মেছেন, তার ছিটেফোঁটাও কি সেবাস্তিয়ান হাল্যার বা আমাদ ডিয়ালোরা (Amad Diallo) পেয়েছিলেন? জীবনের রূঢ় বাস্তবের সঙ্গে লড়াই করে বিশ্বমঞ্চে দাপিয়ে বেড়ানোর যে তাগিদ, সোনার চামচ মুখে জন্মানো ফুটবলে তা পাওয়া বড্ড কঠিন।
ফিলাডেলফিয়ায় ইকুয়েডরকে ১-০ গোলে হারিয়ে গত ১২ বছরে বিশ্বকাপে প্রথম জয়ের স্বাদ পেয়েছে আইভরি কোস্ট (Ivory Coast)। ৯০ মিনিটের মাথায় সেই মহামূল্যবান গোলটা যাঁর পা থেকে এল, তাঁর নাম আমাদ ডিয়ালো। এই তরুণের অতীত জানলে শিউরে উঠতে হয়। মাত্র দশ বছর বয়সে তিনি মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়েন। আফ্রিকা থেকে ভুয়ো বাবা-মায়ের পরিচয়পত্র বানিয়ে তাঁকে আর তাঁর দাদাকে পাচার করে দেওয়া হয় ইতালিতে। উদ্দেশ্য ছিল, ফুটবলের প্রতিভা দেখে ইতালির অ্যাকাডেমিতে বিক্রি করে মোটা টাকা রোজগার করা। বোকা বার্কো ও আটলান্টায় তাঁদের বিক্রিও করে দেওয়া হয়। কিন্তু ডিএনএ পরীক্ষায় জালিয়াতি ধরা পড়ার পর ইতালির ফুটবল সংস্থা ভুয়ো নথি জমার অপরাধে ওই কিশোরকে ৪২ হাজার ইউরো জরিমানাও করেছিল! এত অন্ধকারের মধ্যেও ফুটবলের আলো নিভে যায়নি। নিজের প্রতিভার জোরে আটলান্টা থেকে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডে বিক্রি হলেন ৩৮ মিলিয়ন ইউরোতে। আর আজ তিনি বিশ্বকাপের মঞ্চে দেশের ত্রাতা।
ডিয়ালোর সতীর্থ সেবাস্টিয়ানের (Sebastien Haller) গল্পটাও কম রোমাঞ্চকর নয়। আয়াখস আমস্টারডামে খেলার সময় তাঁর টেস্টিকুলার ক্যানসার ধরা পড়ে। অনেকেই হয়তো ভাবতেন, এখানেই সব শেষ। কিন্তু আফ্রিকার ধুলোমাখা জীবনযুদ্ধ থেকে উঠে আসা সেবাস্তিয়ান হার মানেননি। ক্যানসারকে হারিয়ে শুধু মাঠে ফেরাই নয়, আফ্রিকান কাপ অফ নেশনসের ফাইনালে জয়সূচক গোলটিও এসেছিল তাঁরই পা থেকে। আইভরি কোস্ট প্রমাণ করছে, ফুটবলে শুধু বল পায়ে কারিকুরি লাগে না, লাগে অদম্য জীবনীশক্তি।
আমেরিকার এই সবুজ গালিচায় আইভরি কোস্ট শুধু একটি ম্যাচ জেতেনি, তারা গোটা বিশ্বকে জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার এক অনবদ্য আখ্যান শুনিয়ে গেল। আগামী দিনগুলিতে এই রূপকথার বইয়ে আরও কত পাতা যোগ হয়, সেটাই এখন দেখার।
