অভিজিৎ ঘোষ, আলিপুরদুয়ার: তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপি। রাজনীতিতে তারা যুযুধান দুই পক্ষ। একজন রাজ্যের শাসকদল, আরেকজন রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল। প্রায় সব ইস্যুতেই তারা দুই মেরুতে। তবে আলিপুরদুয়ারের (Alipurduar) মথুরায় এই দুই দলের নেতাদের গলায় গলায় মিল। তবে সব জায়গায় নয়। মিল কেবল জুয়ার বোর্ড বসানো আর মদের আসর জমানোর ক্ষেত্রে। দুর্গাপুজোর পর থেকেই আলিপুরদুয়ার-১ ব্লকের বিভিন্ন এলাকায় যাত্রাপালা, অর্কেস্ট্রার নামে মদ-জুয়ার আসর বসছে। সেগুলো দেখেও চোখ বন্ধ রেখেছে প্রশাসন। আর বিজেপির সঙ্গে তৃণমূলের যতই রাজনৈতিক ‘শত্রুতা’ থাক না কেন, এখানে কিন্তু তৃণমূল ও বিজেপির কয়েকজন নেতা একসঙ্গে মদ, জুয়ার আসর বসাচ্ছে। তাই অন্য নানা দুর্নীতিতে যেমন একপক্ষের বিরুদ্ধে অপরপক্ষ সরব হয়, মথুরায় জুয়ার আসর বসানো নিয়ে কোনও দলের নেতার বিরুদ্ধে অন্য কোনও দলের নেতার মুখে টুঁ শব্দটি নেই।
সম্প্রতি আলিপুরদুয়ার-১ ব্লকের তপসিখাতা, মথুরা চিলাপাতা, শালকুমার এলাকায় এই ছবি দেখা গিয়েছে। সম্প্রতি মথুরা চা বাগানের মহল্লায় অর্কেস্ট্রা সহকারে মদ, জুয়ার আসর বসেছিল। সেখানে প্রায় ৫০টি মদের দোকানও ছিল। আর জুয়ার বোর্ড বসেছিল প্রায় ৩০টি। কালীপুজোর পরপর এই অনুষ্ঠানের আয়োজনে করা হয়েছিল। সেই অয়োজনে জড়িত ছিলেন তৃণমূলের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, চা শ্রমিক সংগঠনের নেতা, এমনকি বিজেপির স্থানীয় প্রভাবশালী চা শ্রমিক নেতাও। কাজেই কোনও দলই কারও বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ করছে না। তারও কয়েকদিন আগে, বিচিত্রানুষ্ঠানের আয়োজনকে সামনে রেখে স্থানীয় কয়েকজন তৃণমূল, বিজেপির নেতা মিলে মথুরা চা মহল্লায় একইভাবে জুয়ার আসর বসিয়েছিলেন। মথুরা হাটে আবার স্থানীয় বুথ স্তরের তৃণমূল নেতা, বিজেপির অঞ্চল স্তরের নেতারা মিলে জুয়ার বোর্ড বসানোর কাজে মদত দিয়ে আসছেন। অভিযোগ, আলিপুরদুয়ার-১ পঞ্চায়েত সমিতির এক সদস্যও এইসব কাজে মদত দিচ্ছেন ওই চত্বরে।
যা নিয়ে রীতিমতো ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। তবে নেতাদের ভয়ে এলাকার লোকজন মুখ খুলতে সাহস পান না। আর খালি সাধারণ মানুষ নন, দুই দলেরই নীচুতলার কর্মীরাও ক্ষুব্ধ। কারণ এলাকার লোকজনের কাছে তাঁদেরই তো জবাবদিহি করতে হচ্ছে।
দুই ফুলের নেতারা জুয়ার আসর বসার অভিযোগ অস্বীকার করছেন না। তবে নিজের দলের নেতারা যে জড়িত, সেটা অবশ্য প্রকাশ্যে স্বীকার করছেন না। তৃণমূলের আলিপুরদুয়ার -১ ব্লক সভাপতি তুষারকান্তি রায়ের কথায়, ‘এই মদ, জুয়ার আসর আগে অনেক জায়গায় বসত। সেটা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কিছু জায়গায় বিক্ষিপ্তভাবে ওগুলো দেখা যাচ্ছে এখনও। সেটা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে প্রশাসন। কেউ অপরাধ করলে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে।’ অন্যদিকে, বিজেপির আলিপুরদুয়ার ৩ নম্বর মণ্ডলের সভাপতি সাধন সাহার কথায়, ‘আসর বসছে ঠিকই, তবে আমাদের দলের কেউ এগুলোতে যায় না। এসবের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নেই। বুথ স্তরের কর্মীরাও ওই অপরাধমূলক কাজে যোগ দেয় না।’
আলিপুরদুয়ার-১ ব্লকের বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠানের আড়ালে মদ, জুয়ার আসর বসানোর অভ্যাসকে ঐতিহ্য বলে দাবি করা হচ্ছে। অনেক জায়গায় অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তারা এই ‘অভ্যাস’ ত্যাগ করতে পেরেছেন। তবে কিছু জায়গায় এখনও এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ঐতিহ্যর নামে দেদার মদ, জুয়ার আসর বসানো হচ্ছে। সেখানে কমবয়সি ছেলেমেয়েদের ভিড় দেখা যাচ্ছে। অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তারা মোটা টাকা নিচ্ছেন জুয়ার বোর্ড বসানোর জন্য। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছে বিভিন্ন সংগঠন। রাজি পারহা সারনা প্রার্থনা সভা ভারত সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক সুশীল ওরাওঁ বলেন, ‘অনুষ্ঠান তো খারাপ কিছু নয়। তবে গভীর রাত পর্যন্ত অনুষ্ঠান চালানো, সেখানে মদ, জুয়ার আসর বসানো খারাপ। কিছু চালাক লোক এই অনুষ্ঠানগুলোর আয়োজন করে মোটা টাকা পকেটে ভরে। আর কমবয়সি ছেলেমেয়েরা মদ খাওয়া, জুয়া খেলায় মেতে উঠছে।’
