সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, ডালাস, ২২ জুন : আটলান্টার স্টেডিয়ামে কিক অফের তখন ঠিক ৪৩ মিনিট বাকি। ৩৬০ ডিগ্রির বিশাল জায়েন্ট স্ক্রিনে আচমকাই ভেসে উঠল একটা হাসিমুখ। মুখে চুইংগাম, চোখেমুখে অমলিন সারল্য আর কৈশোরের ছাপ। নিজেকে স্ক্রিনে দেখেই নিজস্ব সেই সংক্রামক আনন্দে হাত নাড়ল ছেলেটি। আর গ্যালারি ফেটে পড়ল এক গগনভেদী গর্জনে! বল পায়ে পড়ার আগেই আটলান্টার আবহাওয়া বদলে দিলেন তিনি। বিশ্বকাপের মঞ্চে এখন জেন জেডের নতুন ক্রেজ-লিওনেল মেসি (Lionel Messi), কিলিয়ান এমবাপে বা ভিনিসিয়াস জুনিয়ার নন, বরং স্পেনের ১৯ নম্বর জার্সিধারী ওই ছেলেটি। লামিনে ইয়ামাল (Lamine Yamal)! ইউএস জাতীয় দলের প্রাক্তন ম্যানেজার তথা স্প্যানিশ বেস ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিল নিউটাল এই পাগলামি দেখে হতবাক। তাঁর কথায়, ‘হোটেলের বাইরে দেড় হাজার মানুষের ভিড়, আর তার মধ্যে অন্তত হাজার খানেক মানুষ শুধু ইয়ামালের জার্সি পরে দাঁড়িয়ে আছে!’ ইনস্টাগ্রামে সাড়ে ৪৩ মিলিয়ন ফলোয়ারের গণ্ডি পেরোনো এই তরুণ জাদুকর এখন আমেরিকার রাজপথ থেকে সামাজিক মাধ্যম-সবখানেই একচ্ছত্র অধিপতি।
এপ্রিলের হ্যামস্ট্রিং চোট সারিয়ে কেপ ভের্দের বিরুদ্ধে গোলশূন্য হতাশার ম্যাচে মাত্র ১৯ মিনিট খেলেছিলেন। কিন্তু সৌদি আরবের বিরুদ্ধে প্রথম স্টার্ট পেয়েই তিনি যেন এক মায়াবী তুলিতে গোটা দলের ছবি বদলে দিলেন। মাঠে নেমেই স্পেনের খেলায় ফেরালেন গতি, তেজ আর নির্ভীক এক আগ্রাসন। নিজের প্রথম বিশ্বকাপ স্টার্টে গোল করতে তাঁর সময় লাগল মাত্র ৫৯৮ সেকেন্ড। ১৮ বছর ৩৪৩ দিন বয়সে গোল করে ভেঙে দিলেন স্বয়ং মেসির (১৮ বছর ৩৫৭ দিন) রেকর্ড। ছুঁয়ে ফেললেন পেলেকে। ১৯৫৮ সালে ১৭ বছরের পেলের পর ইয়ামালই দ্বিতীয় ফুটবলার, যিনি ১৮ বা তার কম বয়সে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার স্পর্ধা দেখালেন। এই গোলেই আটলান্টার গ্যালারি যেন আক্ষরিক অর্থেই নেচে উঠল। ৪-০ গোলের এই জয়ে মিকেল ওয়ারজাবালও মাত্র ২৫ মিনিটে জোড়া গোল ও এক অ্যাসিস্ট করে ইতিহাস ছুঁলেন ঠিকই, কিন্তু মাঠের আসল জাদুকর ছিলেন ওই বিস্ময় বালক। ম্যাচ শেষে ছেলেমানুষি উচ্ছ্বাসে ইয়ামাল বলছিলেন, ‘প্রথম স্টার্টেই গোল-স্বপ্ন সত্যি হল! গত বিশ্বকাপটা তো আমি স্কুলের বেঞ্চে বসে দেখেছি।’
তাঁর এই উত্থান শুধু পরিসংখ্যানের পাতায় নয়, ফুটবল-বিশ্লেষক থেকে শুরু করে কিংবদন্তিদের চোখেও মুগ্ধতার ঘোর তৈরি করেছে। স্প্যানিশ সাংবাদিক গিলেম বালেগের চোখে ইয়ামাল যেন বিশ্বজয়ের দাম্ভিকতা নিয়ে মাঠে নামেন, ‘এটা কি দম্ভ নাকি আত্মবিশ্বাস? আসলে দুটিই। ও যেন পাড়ার পাঁচজনের ফুটবল খেলার নির্ভেজাল আনন্দটাই এই বিশ্বমঞ্চে খুঁজে পায়।’ কিংবদন্তি ওয়েন রুনির বিশ্লেষণ আরও গভীর। রুনি বলছেন, ‘তরুণ মেসি যখন বার্সেলোনায় আসে, তখন সেখানে রোনাল্ডিনহোর মতো মহাতারকারা ছিলেন। কিন্তু ইয়ামাল এমন এক সময়ে বার্সেলোনা ও স্পেনে এসেছে, যেখানে ও নিজেই দলের প্রধান ভরসা। এই বয়সেই গোটা দলের চাপ নিজের কাঁধে তুলে নেওয়াটা সত্যিই অভাবনীয়।’ প্রাক্তন স্প্যানিশ ডিফেন্ডার সিজার অ্যাজপিলিকুয়েতার মতে, এই স্বাধীনতা ও আত্মবিশ্বাস কাউকে শেখানো যায় না। প্রতিপক্ষ কোচ জিওর্জিওস ডোনিসও একবাক্যে স্বীকার করেছেন, স্কিল নয়, খেলা পড়ার অবিশ্বাস্য ক্ষমতাটাই ইয়ামালকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে দেয়।
পরের রাউন্ডের কথা ভেবে প্রথমার্ধের পরই সতর্কতামূলকভাবে তাঁকে তুলে নেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। থমাস ফ্রাঙ্কের মতো কোচরা যখন ইয়ামালের এই অসামান্য প্রতিভার প্রশংসা করছেন, তখন একটাই সতর্কবার্তা দিচ্ছেন-‘পা মাটিতে রাখাটা সবচেয়ে জরুরি।’ ইয়ামালের ১৯তম জন্মদিনের ঠিক এক সপ্তাহ পরই বিশ্বকাপের ফাইনাল। এই মায়াবী রূপকথার শেষে, স্প্যানিশ ফুটবলের এই নতুন জাদুকর কি পারবেন তাঁর দলকে সেই স্বপ্নের মঞ্চে পৌঁছে দিতে? সময়ই হয়তো তার উত্তর দেবে, তবে আটলান্টার রাত অন্তত এক নতুন মহাতারকার জন্মের সাক্ষী হয়ে রইল।

