তদন্তে কী জানা যাবে, তা অনিশ্চিত। তবে ৬টি তাজা প্রাণ বলি হয়ে গেল। নিহতদের মধ্যে শিশুও আছে। আর্থিক সাহায্য ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তদন্ত বা সরকারি অর্থ- কোনওকিছুতেই ৬ জনের অভাব পূরণ হবে না। ময়নাগুড়ির কাছে দুর্ঘটনার বলি হয়েছেন এঁরা। রাজ্যে উন্নয়নের রোডম্যাপ পেশের আগের দিন এতজনের মৃত্যু অনেক প্রশ্নের জন্ম দিল। নিহতরা সবাই বাসের যাত্রী ছিলেন। বাসটি উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগমের (এনবিএসটিসি)।
তদন্ত সব ঘটনাতেই হয়। তদন্তের ঘোষণায় জনরোষ প্রশমিত করা যায়। সবক্ষেত্রে অবশ্য তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসে না। এলেও তদন্তের ভিত্তিতে সবসময় পদক্ষেপ দেখা যায় না। এনবিএসটিসি’র বাসে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সঠিক কারণ সামনে আসবে কি না, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত এনবিএসটিসি’র আধিকারিকদের প্রাথমিক বয়ানে চালককে ক্লিনচিট দেওয়া হয়েছে। তদন্ত ছাড়াই এমন ক্লিনচিট সন্দেহের উদ্রেক করবেই।
কেননা, দুর্ঘটনাগ্রস্ত বাসটির অধিকাংশ যাত্রীর আঙুল চালকের দিকেই। কারও অভিযোগ, চালক পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন না। কেউ অভিযোগ করছেন, অত্যন্ত দ্রুতগতি ছিল বাসটির। ব্যস্ত জাতীয় সড়কে বাসের মতো গণপরিবহণের জন্য সেই গতি কাম্য ছিল না। এমনও অভিযোগ উঠেছে যে, যাত্রীরা গতি কমানোর জন্য বারবার আর্জি জানিয়েছেন। এমনকি কেউ কেউ বাস থামিয়ে চালককে চোখে-মুখে জল দিয়ে সুস্থ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
যাত্রীদের অভিযোগ, চালক কারও কথায় কর্ণপাত করেননি। পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তাঁর আঙুল বাসের যান্ত্রিক ত্রুটির দিকে। অথচ কনডাক্টরের যুক্তি অনুযায়ী টায়ার ফেটে যাওয়ায় বাসটি আর চালকের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। এরকম যুক্তি, অজুহাত প্রায় প্রতিটি দুর্ঘটনায় থাকে। কিন্তু তাতে কতগুলি প্রাণের পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার ক্ষতিপূরণ হয় না।
বাসের মতো যাত্রী পরিবহণে চালকদের অনেক বেশি সতর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়। বাস চলাকালীন কার্যত তাঁদের ওপরই থাকে যাত্রীদের জীবনের দায়িত্ব। চালকরা সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করলে দুর্ঘটনা অবধারিত। ময়নাগুড়ির দুর্ঘটনার দিন অনেক দূরে মুম্বই শহরে দুজনের মৃত্যু হয়েছে একটি বিলাসবহুল গাড়ির চালকের অবিমৃশ্যকারিতার কারণে। দুর্ঘটনার সময় ওই গাড়িটি ঘণ্টায় ২৫১ কিলোমিটার গতিবেগে চলছিল বলে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।
চালকের যুক্তি অনুযায়ী বাসে যান্ত্রিক ত্রুটির কথা সত্যি হলে এনবিএসটিসি’র দিকে আঙুল উঠবে। দুর্ঘটনাগ্রস্ত বাসটি খুব পুরোনো নয়। মাত্র দু’বছরের পুরোনো। সেক্ষেত্রে বাসটির রক্ষণাবেক্ষণে ত্রুটি ছিল কি না- সেই প্রশ্ন ওঠে। যদি ফিটনেস না থাকে, তাহলে বাসটিকে পথে নামানো হল কেন? এরকম আরও অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলে না। সদ্য পরিবহণ প্রতিমন্ত্রী আনন্দময় বর্মন ঘোষণা করেছেন, এরপর থেকে বাস ছাড়ার আগে চালকদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা পরীক্ষা করা হবে।
তাতেও এই প্রশ্ন এড়ানো যায় না যে, রোজ এত সংখ্যক চালকের শারীরিক, মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার পরিকাঠামো এনবিএসটিসি’র আছে কি না। এই সংস্থার মতো রাজ্যের প্রায় সব রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগম চলে ভরতুকিতে। পথে চলার মতো বাসের সংখ্যা যেখানে পর্যাপ্ত নয়। তাছাড়া নিয়োগ বন্ধ থাকায় বাস রক্ষণাবেক্ষণ করার কর্মীর অভাব। সংস্থা পরিচালনায় আধিকারিকেরও সংকট।
এনবিসিটিসি’র ডিপোগুলি অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়া বলে প্রায়ই অভিযোগ ওঠে। এতসব সমস্যা সামলে যাত্রীসুরক্ষার দিকে নজর কমে যাওয়া স্বাভাবিক। ময়নাগুড়িতে ৬ জনের প্রাণ চলে যাওয়া সেই বিপদকে আরও একবার সামনে নিয়ে এল। ফলে যতই তদন্ত হোক, ভবিষ্যতে এমন কাণ্ডের পুনরাবৃত্তি হবে না- তার নিশ্চয়তা কি এনবিএসটিসি কর্তৃপক্ষ দিতে পারবে? নাকি তদন্ত হচ্ছে বলে স্বজনহারা পরিবারগুলি নিশ্চিন্ত হতে পারবে?

