পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতায় নতুন অশনিসংকেত

পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতায় নতুন অশনিসংকেত

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


রণধীর চক্রবর্তী

ইতিহাস কখনও হুবহু নিজের পুনরাবৃত্তি করে না, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত ধারা বারবার ফিরে আসে সম্পূর্ণ নতুন আকারে। গত দশকে পশ্চিম এশিয়ায় আইএসআইএস-এর উত্থান কোনও আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি কেবল ধর্মীয় উগ্রতার সরল ফলও ছিল না। বরং, এটি ছিল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পতন, সামাজিক বিভাজন এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে তৈরি হওয়া ক্ষমতার শূন্যতার সম্মিলিত পরিণতি। আজ পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল এবং ইরানকে ঘিরে যে বহুমুখী সংঘাত তৈরি হয়েছে, তা কার্যত সেই পুরোনো কাঠামোরই এক নতুন সংস্করণ। রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক মানচিত্র হয়তো বদলেছে, কিন্তু সংকটের অন্তর্নিহিত যুক্তি প্রায় অপরিবর্তিত।

২০১৩-’১৪ সালের দিকে ইরাক ও সিরিয়ার রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ার ফলে বিস্তীর্ণ অঞ্চল কার্যত শাসনহীন হয়ে পড়েছিল। এই প্রশাসনিক শূন্যতায় বিভিন্ন উৎস থেকে আসা শক্তিগুলি একত্রিত হয়— সাদ্দাম হোসেনের আমলের প্রাক্তন সামরিক কর্মকর্তা, প্রান্তিক সুন্নি জনগোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক জিহাদি নেটওয়ার্কের অভিজ্ঞ যোদ্ধারা। এই বৈচিত্র্যময় উপাদানগুলো একত্রিত হয়ে আইএসআইএস গঠন করে, যা দ্রুত একটি সশস্ত্র সংগঠন থেকে আধা-রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রূপান্তরিত হয়। এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল ‘উপলব্ধি’ বা পারসেপশনের রাজনীতি। সুন্নি জনগণের বঞ্চনার অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে আইএসআইএস নিজেদের রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে। বাস্তবতার চেয়েও এই মনস্তাত্ত্বিক উপলব্ধি সাধারণ মানুষের মনে অনেক বেশি প্রভাব ফেলেছিল।

বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও ঠিক একই ধরনের উপাদান নতুন করে সক্রিয় হচ্ছে। ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক দুর্বল হলে তা কেবল একটি পক্ষের সামরিক শক্তির অবক্ষয় নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার ভারসাম্যের চূড়ান্ত ভাঙন। ক্ষমতা কখনও শূন্যে বিলীন হয় না; তা বিচ্ছিন্ন শক্তির মধ্যে দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ছোট ছোট গোষ্ঠী স্বশাসিত হয়ে ওঠে, এলাকা দখলের প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পায় এবং সহিংসতার মাত্রা বাড়ে। এই অরাজক অবস্থায় চরমপন্থী সংগঠনগুলোর বড় কোনও পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না; তারা বিদ্যমান অস্থিরতার মধ্যেই নিজেদের পায়ের তলার মাটি শক্ত করে। তাদের বর্তমান কৌশল সরাসরি জয় নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বজায় রাখা।

এই প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় বড় উদ্বেগ হল সন্ত্রাসবিরোধী কাঠামোর ক্রমবর্ধমান সীমাবদ্ধতা। গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক মহলের সম্মিলিত সহযোগিতার মাধ্যমে আইএসআইএস-এর মতো সংগঠনগুলিকে অনেকটাই দমন করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু যখন একই সময়ে একাধিক ফ্রন্টে আন্তর্জাতিক সংঘাত চলতে থাকে, তখন বৃহৎ শক্তিগুলোর গোয়েন্দা নজর এবং সামরিক সম্পদ ব্যাপকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে নজরদারির যে বড়সড়ো ফাঁক তৈরি হয়, তা আইএসআইএস-এর মতো বিকেন্দ্রীভূত নেটওয়ার্কগুলির জন্য এক অকল্পনীয় সুযোগ। তাদের শক্তি পুনর্গঠনের জন্য বড় কোনও সামরিক জয়ের প্রয়োজন হয় না; বরং প্রতিপক্ষের মনোযোগ বিচ্যুত হওয়াই তাদের জন্য যথেষ্ট।

তৃতীয় এবং সম্ভবত সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিক হল বন্দি জঙ্গিদের প্রশ্ন। সিরিয়া ও ইরাকের বন্দি শিবিরগুলোতে হাজার হাজার আইএসআইএস-সংযুক্ত ব্যক্তি এবং তাদের পরিবার এখনও আটক রয়েছে। এই শিবিরগুলি কেবল বন্দিশালা নয়; এগুলি ভবিষ্যতের চরমপন্থী নেটওয়ার্কের উৎসস্থল। আল-হোল বা আল-সিনার মতো শিবিরগুলোতে কড়া প্রহরার অভাব এবং সেখান থেকে জঙ্গিদের পালানোর ধারাবাহিক চেষ্টা কার্যত তাদের জন্য একটি সুপ্ত বাহিনী প্রস্তুত রাখছে (পূর্বে প্রচারিত মার্চের কল্পিত গণ-পলায়নের তথ্যের বদলে বাস্তব ঝুঁকিটি এখানে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক)। অস্থিরতার সময় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ সামান্য দুর্বল হলেই সংগঠন পুনরুজ্জীবিত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়। অতীতেও আমরা দেখেছি, বন্দি শিবির থেকে মুক্তি পাওয়া কট্টরপন্থীরাই নতুন নেতৃত্ব গঠনে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছে। পাশাপাশি, এই শিবিরগুলিতে বেড়ে ওঠা শিশু ও কিশোরদের নিয়ে একটি ‘হারানো প্রজন্ম’ তৈরি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে, যারা দীর্ঘমেয়াদে উগ্র মতাদর্শের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের নবজাগরণ। বর্তমান সংঘাতকে অনেকেই সুন্নি-শিয়া দ্বন্দ্ব হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন, আবার কেউ কেউ বৃহত্তর সভ্যতার সংঘর্ষ হিসেবে দেখছেন। এই ব্যাখ্যাগুলি পুরোপুরি সঠিক না হলেও, এগুলি উগ্রবাদী প্রচারের জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার। কারণ চরমপন্থা কেবল অস্ত্রের মাধ্যমে নয়, বরং বিষাক্ত ধারণার মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। ‘আমরা বনাম তারা’— এই কৃত্রিম দ্বৈত বিভাজন যত গভীর হয়, উগ্রবাদ তত সহজে সমাজের গভীরে শিকড় গাড়ে। এই বিপজ্জনক বর্ণনাগত মেরুকরণ পশ্চিমা বিশ্বের প্রবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়, যা সংঘাতকে একটি আন্তর্জাতিক মাত্রা দেয়।

রূঢ় অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এই সংকটকে প্রতিদিন তীব্র করছে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, মূল্যবৃদ্ধি এবং বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। যখন রাষ্ট্র নাগরিকদের মৌলিক নিরাপত্তা ও জীবিকার নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সামাজিক আস্থার গভীর সংকট তৈরি হয়। এই চরম আস্থাহীনতা থেকেই বিকল্প শক্তির উত্থান ঘটে— যার মধ্যে সহিংস গোষ্ঠীগুলিও খুব সহজে অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে, অর্থনৈতিক দুর্বলতা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সরাসরি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রূপান্তরিত হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় শরণার্থী সংকট, যা প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির ওপর অসহনীয় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে আরও ভঙ্গুর করে তোলে।

এখানে একটি গভীর কৌশলগত পরিহাস লক্ষণীয়। ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারাই একসময় আইএসআইএস-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একেবারে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। বর্তমান স্বার্থে তাদের দুর্বল করা মানে কার্যত একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ স্তরকে সরিয়ে দেওয়া। এর ফলে যে নতুন নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হয়, তা উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলির জন্য অপ্রত্যাশিত সুযোগ এনে দেয়। বৃহৎ শক্তিগুলির স্বল্পমেয়াদি কৌশলগত লাভ দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিপত্তি বাড়িয়ে দিতে পারে— এই নিরেট বাস্তবতা প্রায়শই নীতি নির্ধারণে উপেক্ষিত থেকে যায়।

তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ২০১৪ সালের মতো কেন্দ্রীভূত বিশাল ‘খিলাফত’ পুনঃপ্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা অনেকটাই কম। বরং আইএসআইএস-এর সম্ভাব্য নতুন রূপটি হবে অনেক বেশি বিকেন্দ্রীভূত ও নেটওয়ার্ক-নির্ভর। ছোট ছোট স্লিপার সেল, সীমান্ত-অতিক্রমী চোরাগোপ্তা কার্যকলাপ এবং তীক্ষ্ণ ডিজিটাল প্রচারণা— এই তিনটি উপাদানই হবে তাদের আগামীদিনের মূল কৌশল। ডিজিটাল মাধ্যম এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী। ভুয়ো তথ্য, গুজব এবং চরম সহিংসতার দৃশ্য মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে একটি ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধক্ষেত্র’ তৈরি করে। এই যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ হারালে বাস্তবতার চেয়েও প্রচার বেশি প্রভাব ফেলে। এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্মগুলি এই প্রচারকে আরও সুরক্ষিত ও দ্রুততর করছে।

এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে আইএসআইএস এক চতুর ‘মধ্যবর্তী খেলোয়াড়’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলি যখন নিজেদের সংঘাতে আবদ্ধ, তখন তাদের পারস্পরিক ক্ষয় আইএসআইএস-এর জন্য সুবর্ণসুযোগ তৈরি করে। আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা নজরদারি এখন ইরান-ইজরায়েল সংঘাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় আইএসআইএস তাদের পুনর্গঠনে তুলনামূলকভাবে কম বাধার মুখোমুখি হচ্ছে। খামেনেই-পরবর্তী ইরানে সম্ভাব্য অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তৈরি হলে সেটিও তাদের অন্যতম লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। উপরন্তু, তাদের প্রচারযন্ত্র বর্তমান সংঘাতকে ‘শত্রুদের আত্মবিনাশ’ হিসেবে তুলে ধরে বৈশ্বিক স্তরে একক-আক্রমণ প্রবণতাকে ব্যাপকভাবে উসকে দিচ্ছে। অন্যদের যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েই আইএসআইএস তার প্রত্যাবর্তনের পথ নির্মাণ করছে। নজরদারির ঘাটতি, স্থানীয় অস্থিরতা এবং মনোযোগের বিচ্যুতি— সব মিলিয়ে তারা পুনর্গঠনের উপযুক্ত রসদ খুঁজে পাচ্ছে।

অতএব, প্রশ্নটি কেবল এই নয় যে, আইএসআইএস ফিরে আসবে কি না। বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে মূল প্রশ্ন হল— আমরা কি সেই কাঠামোগত কারণগুলিকে পরিবর্তন করতে পেরেছি, যেগুলি এই ধরনের ভয়ংকর সংগঠনের জন্ম দেয়? রাষ্ট্রের প্রশাসনিক দুর্বলতা, সামাজিক বিভাজন, দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তাশূন্যতা এবং বর্ণনাগত মেরুকরণ— এই মৌলিক উপাদানগুলি যদি অপরিবর্তিত থাকে, তবে উগ্রবাদ অবধারিতভাবে নতুন রূপে ফিরে আসবে। পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান জ্বলন্ত পরিস্থিতি সেই কঠিন সত্যটিকেই আবার সামনে আনছে। চরমপন্থা কোনও বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এটি একটি গভীর ব্যবস্থাগত প্রতিক্রিয়া। সেই ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল না করলে, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কারও পক্ষে সম্ভব নয়— শুধু তার রূপ বদলাবে, কিন্তু তার ধ্বংসাত্মক ফলাফল নয়।

(লেখক অধ্যাপক)  



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *