সৌরভ রায়, কুশমণ্ডি: এ যেন মধ্যযুগীয় বর্বরতা। রাজনৈতিক নেতার ক্ষমতার জাহির। নাহলে বর্তমান সময়ে ছেলের অসুস্থতার জন্য গ্রামেরই বাসিন্দা দূরসম্পর্কের আত্মীয়কে ডাইন অপবাদ দিয়ে কেউ মানুষের মল খাওয়ায়?
এমনই মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে কুশমণ্ডির উদয়পুর পঞ্চায়েতের পূর্ব বাসইল গ্রামের পঞ্চায়েত সদস্য বিজেপির গোপাল বর্মন এবং তাঁর স্যাঙাতদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গোপালের ১৫ বছরের ছেলে গেদেলু বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ। ছেলের অসুস্থতার জন্য কয়েকদিন ধরে গোপাল গ্রামেরই প্রৌঢ় তারকচন্দ্র রায়কে দায়ী করেন। বুধবার দুপুরে তারককে তাঁর বাড়ি থেকে ঘাড়ে গামছা পেঁচিয়ে বাইরে বের করে নিয়ে আসেন গোপাল ও তাঁর দলবল। টানতে টানতে ওই প্রৌঢ়কে নিয়ে যাওয়া হয় বেশ কিছুটা দূরে। তারপর শুরু হয় বেধড়ক মার। চর, লাথি, ঘুসি চলতে থাকে দীর্ঘ সময় ধরে। তাঁর জন্য ছেলে অসুস্থ, এই স্বীকারোক্তি নিতে বাঁশ দিয়েও পেটানো হয় ৫৮ বছরের তারককে। মারাত্মক অভিযোগ, মাটিতে ফেলে তাঁর মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় ফাঁপা বাঁশের অংশ। সেই বাঁশ দিয়ে মুখে ঢেলে দেওয়া হয় মানুষের মল। তারকের আর্তনাদে গ্রামের মানুষ ছুটে এলে গোপাল ও তাঁর সঙ্গীরা গা-ঢাকা দেন। ঘটনায় অসুস্থ হয়ে পড়া তারককে স্থানীয়রা কুশমণ্ডি হাসপাতালে ভর্তি করেন। নিন্দার ঝড় বয়ে যায় এলাকায়। গোপালের গ্রেপ্তারির দাবিতে সরব হন গ্রামের মানুষ। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার রাতে কুশমণ্ডি থানায় বিজেপি নেতা গোপাল সহ ১০ জনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন তারক। তিনি বলেন, ‘অসুস্থ ছেলের কোনওরকম চিকিৎসার ব্যবস্থা করেনি গোপাল। পরিবর্তে ছেলের অসুস্থতার জন্য আমাকে চিহ্নিত করে বিজেপি নেতা গোপাল। আমি ডাইন বলে গ্রামে রটিয়ে দেওয়া হয়। বুধবার অকথ্য অত্যাচার করা হল আমাকে। গ্রামের লোকজন ছুটে না এলে প্রাণে মেরে ফেলত।’
এমন অভিযোগ পেয়েই গোপাল সহ বাকিদের খোঁজে তল্লাশি শুরু করে পুলিশ। শুক্রবার মূল অভিযুক্ত গোপাল ও তাঁর এক সঙ্গীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কুশমণ্ডি থানার আইসি তরুণ সাহা বলেন, ‘মূল অভিযুক্ত সহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দুজনকে শনিবার আদালতে তোলা হবে। বাকিদের খোঁজে তল্লাশি চলছে।’
এমন ঘটনা স্থানীয় এলাকায় তো বটেই, শোরগোল ফেলে দিয়েছে রাজনৈতিক মহলেও। কুশমণ্ডির বিধায়ক তৃণমূলের রেখা রায় বলেন, ‘বিজেপির ওই পঞ্চায়েত সদস্য যা করেছে, তার নিন্দা জানানোর কোনও ভাষা নেই। অভিযুক্তরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাক, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঘটানোর সাহস কেউ না পায়।’ ঘটনায় স্বাভাবিকভাবে অস্বস্তিতে পড়েছে বিজেপি। দলের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা কমিটির সহ সভাপতি রঞ্জিত রায়ের বক্তব্য, ‘এমন ঘটনা অবশ্যই নিন্দনীয়। আইন আইনের পথে চলবে।’ পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞানমঞ্চের জেলা সম্পাদক অনিমেষ লাহিড়ি ঘটনার তীব্র নিন্দা করে জানান, দ্রুত ওই গ্রামে কুসংস্কারবিরোধী কর্মসূচি নেবেন তাঁরা।
অভিযুক্ত দুজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও ক্ষোভ রয়েছে গ্রামে। দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবিতে সরব গ্রামবাসীরা।
