কুমারগঞ্জ: মিড-ডে মিলের সরকারি অনুদান থেকে শুরু করে স্কুলের বহুমূল্য গাছ ও পুরোনো বই বিক্রি—একাধিক খাতে লক্ষাধিক টাকা তছরুপের অভিযোগকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার উত্তাল হয়ে উঠল দক্ষিণ দিনাজপুরের (Dakshin Dinajpur) কুমারগঞ্জ ব্লকের হরিপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়। অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক সত্যম দত্তের বদলির দাবিতে স্কুল চত্বরে বিক্ষোভ দেখান অভিভাবকেরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে খোদ কুমারগঞ্জের (Kumarganj) বিডিও সহ প্রশাসনিক কর্তারা স্কুলে ছুটে যান।
স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকদের অভিযোগ, গত প্রায় দেড় বছর ধরে স্কুলের মিড-ডে মিল ফান্ডের প্রায় এক লক্ষ টাকারও বেশি অর্থের কোনো হিসাব মিলছে না। গ্রামবাসীদের তীব্র চাপের মুখে প্রধান শিক্ষক নাকি ওই টাকার হিসাব না থাকার কথা স্বীকারও করেছেন। যদিও প্রধান শিক্ষক সত্যম দত্ত সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে দাবি করেছেন, “এই রকম কিছু ব্যাপার নেই।”
তবে এখানেই শেষ নয়। অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ। টেন্ডার কিংবা বন দপ্তরের কোনোরকম আইনি অনুমতি ছাড়াই স্কুল চত্বরে থাকা দুটি বড় কদম গাছ নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। এমনকি ওই গাছ বিক্রির টাকারও কোনো হদিস নেই। পাশাপাশি, স্কুলের পুরোনো বই বিক্রির অর্থ এবং বিদ্যালয়ের পাশের একটি পুরোনো ভগ্নপ্রায় ভবন ভাঙার পর প্রাপ্ত টেন্ডারের টাকার হিসাব নিয়েও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন গ্রামবাসীরা। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া চলাকালীন। স্থানীয় বাসিন্দাদের স্কুলের শংসাপত্র দেওয়ার নামে ৫০ টাকা বা তার বেশি অর্থ আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ। শতাধিক মানুষের কাছ থেকে এভাবে টাকা নেওয়া হলেও তার কোনো অফিশিয়াল রেজিস্টার বা খাতা রাখা হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, রেজিস্টার বহির্ভূত বহিরাগতদেরও টাকার বিনিময়ে স্কুলের শংসাপত্র বিলি করা হয়েছে।
এই সমস্ত চাঞ্চল্যকর আর্থিক দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে গত ১৯ অগাস্ট স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবর বিদ্যালয় পরিদর্শক (SI), জেলা প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তর এবং জেলাশাসকের দপ্তরে একটি অভিযোগপত্র জমা দিয়েছিলেন এলাকাবাসী। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই এদিন বিডিও শুভঙ্কর সাহা এবং কুমারগঞ্জ উত্তর চক্রের এসআই দেবাশিস তামাং স্কুল পরিদর্শনে আসেন।
তদন্তকারী আধিকারিকরা স্কুল ছাড়তেই নতুন করে উত্তেজনা ছড়ায়। অভিযোগ ওঠে, প্রধান শিক্ষকের শ্যালক (যিনি নিজেও একজন প্রাথমিক শিক্ষক) স্কুল চলাকালীন সেখানে এসে সহকারী শিক্ষক দেবোজ্যোতি দাশগুপ্তকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। এই ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন গ্রামবাসী। তাঁরা প্রধান শিক্ষকের শ্যালককে ঘিরে ধরলে তিনি কোনোক্রমে এলাকা ছাড়েন। এরপর প্রধান শিক্ষকের স্ত্রী স্কুলে পৌঁছালে তাঁকেও ঘিরে বিক্ষোভ দেখান অভিভাবকরা। সহকারী শিক্ষক দেবোজ্যোতি দাশগুপ্ত জানান, গত দেড় বছরে একাধিক আর্থিক দুর্নীতি হয়েছে এবং তিনি এর সঠিক তদন্ত দাবি করেছেন।
পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে একসময় পুলিশ ডাকার উপক্রম হয়, তবে শেষ পর্যন্ত স্থানীয়দের হস্তক্ষেপে তা এড়ানো সম্ভব হয়। এবিষয়ে কুমারগঞ্জ উত্তর চক্রের এসআই দেবাশিস তামাং জানিয়েছেন, ‘সমস্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে।’ বিডিও শুভঙ্কর সাহার বক্তব্য, ‘বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে।’

