বিশ্বজিৎ প্রামাণিক, কুমারগঞ্জ: একে কন্যাসন্তান প্রসব। তার আবার গায়ের রং কালো। দেবীপক্ষে শ্বশুরবাড়িতে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হলেন এক বধূ। অভিযোগ, শিশুকন্যাকে নিজের সন্তান হিসাবে মানতে ‘অস্বীকার’ করছেন বাবা। এমনকি তিনি গলা টিপে খুনের চেষ্টা করেছেন। ঘটনা দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কুমারগঞ্জ ব্লকের মঞ্জুরিচক এলাকার। নির্যাতিতা বধূ থানায় স্বামী সহ শ্বশুরবাড়ির মোট তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন। ইতিমধ্যেই পুলিশ ওই বধূর স্বামীকে গ্রেপ্তার করেছে। ধৃতের নাম হাবিবুর মণ্ডল। নির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। বাকিদের শীঘ্রই গ্রেপ্তার করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
প্রায় বছর দুয়েক আগে সামাজিকভাবে হাবিবুরের সঙ্গে বিয়ে হয় নাসরিন খাতুনের। দুজন একই গ্রামের বাসিন্দা। বিয়ের সময় নাসরিনের পরিবার যৌতুক হিসাবে অনেক জিনিসপত্র দেয় বলে জানা গিয়েছে। বিয়ের পর থেকে পণের দাবিতে নাসরিনের ওপর অত্যাচার চালাতেন শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা বলে অভিযোগ। এর মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন তিনি।
দুই মাস আগে নাসরিন একটি কন্যাসন্তান প্রসব করেন। তারপর থেকেই পরিবারে নতুন করে অশান্তি শুরু হয়। একে কন্যাসন্তান, তার ওপর আবার গায়ের রং কালো। যাবতীয় দায় যেন নাসরিনের! ক্রমাগত তাঁকে বেশি কথা শোনানো থেকে শুরু করে ওই কন্যাসন্তানকে অবজ্ঞা চলতে থাকে পরিবারের অন্দরে। এমনকি হাবিবুর নিজের শিশুকন্যাকে ‘অন্যের সন্তান’ বলে খোঁচা দিতেন বলে অভিযোগ।
নাসরিনের বয়ান অনুযায়ী, তাঁর ‘কৃষ্ণকলি’ শিশুকন্যাকে ঘিরে রোজই পরিবারে অশান্তি লেগে থাকত। মূলত স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ি মিলিতভাবে তাঁকে নির্যাতন করতেন। হাবিবুরের মতোই তাঁর বাবা-মায়ের কথা ছিল, এই শ্যামবর্ণের মেয়ে কোনওভাবেই তাঁদের নাতনি হতে পারে না, এ অন্যের সন্তান! প্রকারান্তরে নাসরিনের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলতেও অভিযুক্তরা দ্বিধাবোধ করতেন না।
বুধবার অশান্তি চরমে ওঠে। হাবিবুর তাঁর ঔরসজাত শিশুকন্যাকে গলা টিপে খুনের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ। মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে স্বামীর হাতে বেধড়ক মার খান নাসরিন। শেষমেশ প্রাণভয়ে তিনি ওই শিশুকন্যাকে নিয়ে বাপের বাড়িতে আশ্রয় নেন। এরপর স্থানীয়রা জখম নাসরিনকে কুমারগঞ্জ গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে গেলে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। শুক্রবার তিনি কুমারগঞ্জ থানায় মোট তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানান।
ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। প্রতিবেশীরাও ক্ষুব্ধ। সমাজকর্মীরা বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছেন। কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ায় মাকে দোষারোপ অমানবিক ও আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। পুলিশ জানিয়েছে, নাসরিন ও তাঁর শিশুকন্যাকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
