কৌশিক দাস, ক্রান্তি: বাতাসে শরতের গন্ধ। তবে পরিযায়ীদের পরিবারে সেই গন্ধ যেন ফিকে। পুজোর আনন্দ নেই পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিবারে। কেউ বাইরে কাজ করতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন। কেউ আবার অঙ্গ হারিয়ে শয্যাশায়ী। প্রত্যেকের বাড়িতে ছোট সন্তান রয়েছে। ফলে পুজোর পোশাক কেনা দূর, দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন সংস্থান করতে কার্যত দিশেহারা অবস্থা পরিবারগুলির। এদিকে, রাজ্য সরকার শ্রমিকদের ফিরে আসার অনুরোধ করলেও স্থানীয় স্তরে কাজের অভাব থাকায় ভিনরাজ্যে যাওয়া কমছে না ক্রান্তি ব্লকের তরুণদের (Kranti)।
ক্রান্তি ব্লকের কাঁঠালগুড়ির হবিবর রহমান প্রায় ১০ মাস নিখোঁজ। স্থানীয় এক ঠিকাদারের সঙ্গে বাইরে কাজ করতে গিয়েছিলেন তিনি। ঠিকাদার ফিরে এলেও তিনি বাড়ি ফেরেননি। পুলিশ প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়ে খোঁজ মেলেনি হবিবরের। কথা বলতে বলতে চোখ মুছছিলেন তাঁর মা হালিমা খাতুন। হতাশার সুরে তিনি বলেন, ‘এলাকায় সেভাবে কাজ না পাওয়ায় ছেলে বাইরে গিয়েছিল কাজের সন্ধানে। কতদিন ছেলের মুখ দেখিনি, গলার আওয়াজ শুনিনি। কোথায় যে হারিয়ে গেল ছেলেটা! কত খোঁজাখুঁজি করলাম তবুও পেলাম না।’ বৃদ্ধার আক্ষেপ, এদিকে কাজ করে বেশি টাকা রোজগার হলে ছেলেটাকে বাইরে যেতে হত না।
রাজাডাঙ্গার বারোঘরিয়ার তপন রায়ের কাহিনী করুণ। তামিলনাডুতে কাজ করতে গিয়ে দুই হাত, দুই পা খুঁইয়ে বাড়িতে ফিরেছেন। কোম্পানি থেকে ক্ষতিপূরণের যা অর্থ পাওয়া গিয়েছিল চিকিৎসা করতেই সেই টাকা শেষ হয়ে গিয়েছে। বাড়িতে ছোট দুই সন্তান রয়েছে। কারও পুজোর জামা হয়নি। তপনের কথায়, ‘সংসারের দায়িত্ব তুলে নেওয়ার বদলে আমি নিজে শয্যাশায়ী।’ প্রতিবার পুজোর সময় বাড়ির সকলের জন্য নতুন পোশাক নিয়ে ফিরতেন। এখন দৈনন্দিন কাজ করেন স্ত্রী। গত দু’বছর পুজোর আনন্দ ভুলেই গিয়েছেন তাঁর স্ত্রী ও ছোট দুই সন্তান।
বছর দুয়েক আগে মাল ব্লকের কুমলাইয়ের এক পরিযায়ী শ্রমিক সিকান্দার মাহাতো বহুতল থেকে পড়ে মারা যান। বাড়িতে স্ত্রী ও দুই সন্তান রয়েছে। তাঁর স্ত্রী মিতু মাহাতো বলেন, ‘ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, দু’বেলা অন্নের সংস্থান করতে দিশেহারা অবস্থা। পুজোর আনন্দ তাঁদের আর ভাবায় না।’
ক্রান্তির পার্কপাড়ার অমৃত সরকার বছরখানেক আগে মুম্বইয়ের এক বহুতল থেকে পড়ে গুরুতর জখম হন। দীর্ঘ তিন মাস চিকিৎসা করিয়ে এখন কিছুটা সুস্থ তিনি। চিকিৎসক ভারী কাজ করতে নিষেধ করেছেন। বাড়িতে তাঁদের এক সন্তান রয়েছে। পুজোর আনন্দ কী, জানে না তাঁর পরিবারও।
রাজাডাঙ্গার কাঁঠালগুড়ির ডাবলু রায় পরিবারকে একটু সচ্ছলতার মুখ দেখাতে কেরলে একটি সংস্থার অধীনে কাজ করতে গিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় বাড়িতে ফেরেন। জমি বিক্রি করে চিকিৎসা করেও বাঁচাতে পারা যায়নি তাঁকে। সন্তানকে হারিয়ে শোকে পাথর বৃদ্ধ বাবা-মা।
দক্ষিণ হাঁসখালির তারিকুল ইসলামও স্ত্রী, সন্তানকে একটু ভালো রাখতে কেরলে পাড়ি দিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে গুরুতর জখম হন তিনি। বাড়িতে স্ত্রী, সন্তান রয়েছে।
ক্রান্তি থানার মাঠের সামনে বাড়ি সুরেশ রায়ের। গতবছর নভেম্বর মাসে সিকিমে বহুতলে কাজ করতে গিয়ে মারা যান। মা, বাবা ও স্ত্রী রয়েছেন বাড়িতে।
আর ১০ দিন পর ত্রান্তি ব্লকের বিভিন্ন মণ্ডপেও বেজে উঠবে ঢাক। সকলে মেতে উঠবে পুজো-অঞ্জলি নিয়ে। কিন্তু সুরেশ, অমৃতদের ঘরের দরজা আটকে রাখবে বিসর্জনের বিষণ্ণতা। মুখ্যমন্ত্রীর ঘরে ফেরার আহ্বান আর শ্রমশ্রীর আশ্বাসে সেই দরজা খুলে শরতের রোদ ঢুকতে পারবে কি?
