‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা…।’ কেন্দ্রে ক্ষমতা দখলের পর এই ভাষায় দুর্নীতিবিরোধী যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তারপর কেটে গিয়েছে ১২ বছর। দেশ থেকে দুর্নীতি মুছে গিয়েছে- এমনটা নয়। বরং বহু দুর্নীতি প্রচারমাধ্যম এবং লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যায়। আবার অযোধ্যার রাম মন্দির থেকে প্রণামি চুরির মতো নিন্দনীয় এবং লজ্জাজনক ঘটনাও সামনে চলে আসে।
চুরি, দুর্নীতির আঁধার পশ্চিমবঙ্গের আকাশেও রয়েছে। তৃণমূলের বিরুদ্ধে গত বিধানসভা ভোটে বিজেপির প্রচারের অন্যতম প্রধান ইস্যুই ছিল দুর্নীতি। পালাবদলের পর একের পর এক চুরি, দুর্নীতির ফাইল খোলা হচ্ছে। শেষপর্যন্ত কতগুলি অভিযোগের নিষ্পত্তি হবে এবং প্রকৃত দোষীর শাস্তি হবে- সেটা অবশ্য অনিশ্চিত।
তবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার বাংলাকে দুর্নীতিমুক্ত করতে যে পদক্ষেপগুলি করছে, তা জনসাধারণের প্রত্যাশাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। দুর্নীতি রুখতে একগুচ্ছ টোল ফ্রি ফোন নম্বর চালুর সিদ্ধান্ত এবং কাটমানি, অবৈধ টোল কিংবা বেআইনি মদের ঠেকের বিরুদ্ধে বিজেপি সরকারের কঠোর পদক্ষেপকে নবান্নের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক বলাই যায়।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসকের স্বচ্ছতা ও সততাই শেষ কথা। তৃণমূল জমানায় শাসকদলের একাধিক নেতা-মন্ত্রীর বিরুদ্ধে একের পর এক চুরি ও দুর্নীতির অভিযোগ সাধারণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছিল। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, সরকারি সুযোগসুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে কাটমানি এবং তোলা আদায়ের সংস্কৃতি জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছিল সিন্ডিকেটরাজের রমরমা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। পাড়ায় পাড়ায় সাধারণ মানুষের মুখে তৃণমূলের মামুলি জনপ্রতিনিধিদেরও সম্পত্তি রাতারাতি ফুলেফেঁপে ওঠার অভিযোগ শোনা যেত। প্রাকৃতিক বিপর্যয় কিংবা জনকল্যাণমুখী প্রকল্প, ত্রাণ বা সাধারণের হকের অর্থ লুটে নেওয়ার মতো সীমাহীন দুর্নীতিই পূর্বতন শাসকদলের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল।
বিজেপি সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের শুরু থেকেই দুর্নীতিবিরোধী ভাবমূর্তি গড়ে তোলা জরুরি ছিল। পোড়খাওয়া রাজনীতিক মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ভালোই জানেন, বাংলার রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির যে জাল বিস্তার করে আছে, তা উপড়ে ফেলা সহজ নয়। টোল ফ্রি নম্বর চালু করে সাধারণ মানুষের অভিযোগ শোনার ব্যবস্থা রাতারাতি ম্যাজিকের মতো সব দুর্নীতি বন্ধ করে দেবে না।
বরং এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে হাজারো প্রশ্ন উঠতে পারে, সংশয় থাকতে পারে। কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এই মানসিকতা এবং প্রথম দিন থেকে কড়া পদক্ষেপ করার জেদ নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য। অন্তত দুর্নীতিবাজদের মনে যা ভয়ের পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হবে। সেটা সুশাসনের প্রথম শর্ত। আর্থিক দুর্নীতি বা ঘুষ নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু যখন দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয় বা রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে, তখন তা সমাজের জন্য বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়।
নতুন বিজেপি সরকার এই রাহুগ্রাস থেকে বাংলাকে মুক্ত করতে সচেষ্ট। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বীকার করুন বা না করুন, পরিবর্তনের পক্ষে মানুষের রায় এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। টোল ফ্রি নম্বর চালু বা কন্ট্রোল রুম তৈরি শুভেন্দুর একটি দীর্ঘ লড়াইয়ের সূচনা মাত্র। ক্ষমতার অলিন্দে থাকা মানুষ যাতে পুনরায় পুরোনো অভ্যাসের দাস না হয়ে পড়েন, তা নিশ্চিত করা হবে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
দুর্নীতিমুক্ত বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে হলে প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে। টোল ফ্রি নম্বরের মাধ্যমে সরাসরি আমজনতার অভিযোগ শোনার প্রয়াস ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্বচ্ছতার প্রতীক। এই ধারা বজায় থাকলে এবং মুখ্যমন্ত্রী নিজে এই ব্যবস্থার ওপর নজরদারি চালাতে পারলে হয়তো বাংলার প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।
The publish দুর্নীতিবিরোধী দাওয়াই appeared first on Uttarbanga Sambad.
