উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক : অন্ধকার যখন ঘনীভূত হয়, তখন নাকি চেনা মানুষটার আসল চেহারা চেনা যায়। কিন্তু পুনের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী কেতন আগরওয়াল হয়তো ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি, যাকে তিনি জীবনসঙ্গী করতে চলেছেন, সেই সিয়া গোয়েল এবং তার গোপন প্রেমিক চেতন চৌধুরী মিলে তার জীবনের ওপর এত বড় একটা ডেথ-ওয়ারেন্ট লিখে রেখেছে (Ketan Agrawal Homicide Case) । লোহাগড় দুর্গের (Lohagad Fort Pune) ৬০০ ফুট গভীর গিরিখাত আজ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা আর ঠাণ্ডা মাথার খুনের। তবে গল্পের শেষ এখানেই নয়; যে ভালোবাসার জন্য এই যুগল এত বড় অপরাধ করল, আজ পুলিশের আলাদা দুটি লক-আপে বসে তারা একে অপরের দিকেই আঙুল তুলছে।
তদন্তে নেমে পুনে পুলিশ যে কল রেকর্ডস (CDR) উদ্ধার করেছে, তা দেখে দুঁদে অফিসারদেরও চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। বিগত ছয় মাসে সিয়া এবং চেতনের মধ্যে ২,০০০ বারের বেশি কথা হয়েছে, যার মোট সময়কাল প্রায় ২৩৮ ঘণ্টা! অর্থাৎ, টানা ১০টা দিন তারা কেবল ফোনে একে অপরের সাথে যুক্ত ছিল। পুলিশ নিশ্চিত, এই দীর্ঘ সময় সাধারণ কোনো প্রেমের আলাপ ছিল না, বরং প্রতিটি মিনিট ব্যয় হয়েছিল কেতনকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার নিখুঁত ছক কষতে। তবে আজ আদালতে সেই কল রেকর্ডকেই হাতিয়ার করে চেতন ও সিয়া প্রমাণ করার চেষ্টা করছে—মূল পরিকল্পনাকারী আসলে অন্যজন!
জাতীয় সংবাদমাধ্যম দি উইক-এর তথ্য অনুযায়ী, সিয়া নিজেই পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে সেই ভয়ঙ্কর ‘কোড ওয়ার্ড’ বা সংকেতের কথা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘটনার দিন দুর্গের একদম প্রান্তে গিয়ে সিয়া যখন নিচের দিকে ঝুঁকে দাঁড়াবে, সেটাই হবে চেতনের জন্য গ্রিন সিগন্যাল। ঠিক সেটাই ঘটেছিল। সিয়া ঝুঁকতেই চেতন পেছন থেকে ধাক্কা মারে কেতনকে। ৬০০ ফুট নিচে পাথুরে মাটিতে আছড়ে পড়ে মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায় একটি প্রাণ।
অথচ পুলিশ সূত্রের খবর, এর আগেও দুবার কেতনকে লোহাগড় দুর্গে নিয়ে গিয়েছিল সিয়া। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সাহসে কুলিয়ে উঠতে না পারায় মিশন ব্যর্থ হয়। দ্বিতীয়বার ব্যর্থ হওয়ার পর ধৈর্য হারিয়ে চেতন সিয়াকে বলেছিল, “তুমি এটা পারবে না, এবার আমি নিজেই এর শেষ দেখব।”
তদন্তকারীরা বলছেন, এই খুন কোনো আকস্মিক ক্ষোভের ফল নয়। এর জাল বোনা হচ্ছিল মাসের পর মাস ধরে। কিছুদিন আগে কেতনের সাথে সিয়ার বালি দ্বীপে ঘুরতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রহস্যজনকভাবে কেতনের পাসপোর্টটি হারিয়ে যায় এবং ট্রিপটি বাতিল করতে হয়। পুলিশ এখন মনে করছে, ওটাও ছিল এই বিশাল ষড়যন্ত্রের একটা অংশ, যাতে কেতনকে পুনের আশেপাশেই কোথাও শেষ করে দেওয়া যায়।
পুনের বিবভেওয়াড়ির এক সম্ভ্রান্ত এলাকায় বেকারি চালাতেন সিয়া, আর চেতনের পরিবারের ছিল ড্রাই ফ্রুটসের ব্যবসা। ব্যবসায়িক সূত্রেই আলাপ এবং তারপর পরকীয়া। কিন্তু ধরা পড়ার পর আজ তাদের সেই ‘অমর প্রেম’ কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। চেতন দাবি করছে, সে সিয়াকে নিয়ে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু সিয়ার পরিবার ধনী হওয়ায় সিয়াই নাকি জোর দেয় যে কেতনকে খুন না করলে তারা কোথাও শান্তিতে থাকতে পারবে না। অন্যদিকে সিয়ার দাবি, পুরো প্ল্যান চেতনের মাথা থেকে বেরিয়েছে। এদিকে চেতনের বাবা বাবুলাল চৌধুরী এবং কাকা উদয়রাম চৌধুরী দাবি করেছেন, চেতন নির্দোষ এবং ঘটনার সময় সে দূরে দাঁড়িয়ে ছিল, সিয়াই কেতনের সবচেয়ে কাছে ছিল।
পুনে পুলিশের তদন্তকারী অফিসাররা জানিয়েছেন, অপরাধ স্বীকার করলেও সিয়া বা চেতন—কারও চোখেই কোনো অনুশোচনা বা আফসোসের বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই। ভালোবাসার নামে যে নৃশংসতার গল্প তারা লোহাগড় দুর্গের পাহাড়ে লিখেছে, তার শেষ পরিণতি এখন আদালতের কাঠগড়ায়।

