রামকৃষ্ণ ও রামলালা

রামকৃষ্ণ ও রামলালা

শিক্ষা
Spread the love


  • পূর্বা সেনগুপ্ত

দেবতা শুধু কি মন্দিরে বা গৃহে থাকেন? সাধকের বা সন্ন্যাসীর ঝুলিতে বিরাজ করেন না?

অবশ্যই করেন। কিছুদিন আগে শ্রীরামকৃষ্ণের গৃহাঙ্গনে কেমনভাবে পূজিত হতেন রঘুবীর, সে সম্বন্ধে বিস্তারিত তথ্য নিবেদন করেছিলাম। সেই আলোচনার সূত্র ধরে একজন আমাকে বললেন, দেবালয় বা গৃহদেবতার অবস্থান গড়ে ওঠে একজন ভক্ত বা সাধকের ভক্তি ও ঈশ্বর বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে। শ্রীরামকৃষ্ণ পরিমণ্ডলে অনেক ভক্ত ছিলেন, যাঁদের জীবনে এইভাবে দেবভাব স্পর্শ করেছে, গড়ে উঠেছে কাহিনীও। সেই কাহিনী কি দেবাঙ্গনের দেবালোচনায় প্রাসঙ্গিক নয়?

চিন্তা করে দেখলাম, সত্যিই তাই। ভারত সন্ন্যাসীর দেশ। কত রমতা সাধু ঈশ্বরের খোঁজে চলেছেন এক তীর্থ থেকে আরেক তীর্থ অভিমুখে। এক সন্ন্যাসীর অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করব।

২০১২ সালে হরিদ্বারের কুম্ভমেলায় গিয়েছিলাম। ছিলাম দেরাদুনের রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমে। সেখানেই এক সন্ন্যাসীর মুখে শোনা।  তিনি আর তাঁর দাদা তখন স্কুলে পড়েন। বাবা ছিলেন এলাহাবাদ শহরে একটি কলেজের প্রিন্সিপাল। ধর্মবোধে অটল। একদিন এক কেদারনাথগামী সন্ন্যাসী তাঁদের গৃহে আতিথ্য গ্রহণ করলেন। পিতা তাঁর দুই পুত্রসন্তানকে সেই সন্ন্যাসীর হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘সাধুর সঙ্গে তীর্থ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ছোটবেলাতেই হয়ে যাওয়া উচিত। আপনি এই দুজনকে নিয়ে যান। আপনার সঙ্গে এরা দুই ভাই কেদারদর্শন করে আসুক আর তার সঙ্গে সাধুসঙ্গও করা হবে।’

এই অসাধারণ ধর্মপ্রাণ পিতা তাঁর দুই পুত্রকে সন্ন্যাসীর হাতে তুলে দিলেন পরম নিশ্চিন্তে। সেই দুই পুত্রই পরবর্তীকালে সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের একজনের মুখ থেকেই এই ঘটনা শোনা।

দুই ভাই সন্ন্যাসীর সঙ্গে চললেন কেদারনাথ দর্শনের উদ্দেশে। তখন পথ সুগম ছিল না। কঠিন পথ, বিশ্রাম নিয়ে ধীরে ধীরে যেতে হত। প্রথম দিন তাঁরা এক সন্ন্যাসীর কুটিয়ায় গিয়ে পৌঁছালেন তখন সকালের শেষ, দুপুর শুরু হবে। সন্ন্যাসী তাঁর কুটিয়ায় দুই ভাই সহ আরেক সন্ন্যাসীকে সাদরে অভ্যর্থনা জানিয়ে বললেন, ‘আজ এখানেই থেকে যেতে হবে। কারণ বিকেলের দিকে মেঘভাঙা বৃষ্টি হবে। ফলে পথে বিপদ অবশ্যম্ভাবী।’

এক সন্ন্যাসী অন্য সন্ন্যাসীর কথা মেনে নিয়ে সেই গুহার মতো কুটিয়ার ভিতর ভালো করে গুছিয়ে বসলেন। কিছুক্ষণ পর একদল কলেজ শিক্ষিকা উপস্থিত হলেন। কলকাতা থেকে এসেছেন, কেদার দর্শনে যাবেন। তাঁদেরকেও মেঘ দেখিয়ে মেঘভাঙা বৃষ্টির পূর্বাভাস দিলেন সেই হিমালয়বাসী সাধু।

আকাশের কোণে এক টুকরো মেঘ। ঘন কালো বটে, কিন্তু ওই মেঘ এত বিপদের কারণ হবে শিক্ষিকার দল মোটেই বিশ্বাস করলেন না। বরঞ্চ হাসাহাসি করে কেদারের পথে এগোলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশ ঘিরে ধরল সেই এক টুকরো মেঘ। তারপর শুরু হল বৃষ্টি। হুহু করে ঠান্ডা নেমে এল। চারিদিক সাদা। এইভাবে এক মহাদুর্যোগের দিন ও রাত কেটে গেল।

পরদিন ঝকঝকে রোদ। তাঁরা চারজন চললেন পথে কেউ বিপদে আছে কি না তা দেখতে। কিছুক্ষণ হাঁটার পরেই সেই শিক্ষিকা দলের সকলের মৃতদেহ এদিক-সেদিক ছড়িয়ে- ছিটিয়ে থাকতে দেখা গেল। আফসোস করতে করতে হিমালয়ের সন্ন্যাসী তাঁদের সৎকার করার ব্যবস্থা করলেন। এই সংবাদ নাকি খবরের কাগজেও প্রকাশিত হয়েছিল।

তীর্থযাত্রী সন্ন্যাসী পরদিন কেদারের উদ্দেশে যখন পথ ধরবেন, তখন কুটিয়ার সন্ন্যাসী তাঁকে বললেন, আমি শৈব সন্ন্যাসী। নর্মদাতীরে দীর্ঘকাল তপস্যা করে এখন বাবা কেদারের দুয়ারে পড়ে রয়েছি। কিন্তু বেশিদিন আমার আয়ু নেই। শরীর যাওয়ার আগে আমি আমার জটায় বাঁধা শৈব সম্প্রদায়ের উপাস্য বানলিঙ্গটিকে কোনও সাধকের হাতে দিয়ে যেতে চাই। আপনাকে আমার যোগ্য বলে মনে হয়েছে। তাই এই লিঙ্গ আপনাকে সমর্পণ করলাম।’ এই বলে দীর্ঘ জটা খুলে সেই লিঙ্গটিকে বের করে তীর্থযাত্রী সন্ন্যাসীর হাতে দিলেন।

লিঙ্গটি একটা নারকেল কুলের বীচির আকৃতি। অবিকল সেই রকম দেখতে, খুব প্রাচীন এটা বোঝা যাচ্ছে। আমি সেই শিবলিঙ্গটি দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলাম, কারণ সে লিঙ্গ তীর্থযাত্রী সন্ন্যাসী তাঁর সঙ্গী দুই বাচ্চা ছেলের একজনকে দিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর সেবায় মুগ্ধ হয়ে। কী পরিস্থিতিতে সেটির হস্তান্তর হয়েছিল সেই ঘটনার দিকে যাব না, আমরা কেবল জানব সন্ন্যাসীর দল কীভাবে তাঁদের উপাস্যকে দেহের মধ্যে নিয়েই এক তীর্থ থেকে আরেক তীর্থে ভ্রমণ করেন।

বিশেষ করে লিঙ্গায়েত সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা জটায় শিবলিঙ্গ ধারণ করে রাখেন। জটা থেকে বের করে তাঁর সেবা করেন, ভোগ দেন, তারপর দেবতা আবার তাঁর চুলের রাশির মধ্যে। এক মোহান্ত থেকে আরেক মোহান্ত, এক সন্ন্যাসী থেকে আরেক সন্ন্যাসীর কাছে চলে দেবতার পরিভ্রমণ। ঠিক এইরকম আরেকটি কাহিনী আমরা শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনেও ঘটতে দেখি। আজ তারই উল্লেখ করা যাক।

বাস্তবিকই সে ছিল এক বিচিত্র কাহিনী। সে আলোচনায় আমরা প্রথমে দক্ষিণেশ্বরে সেই দিনগুলিতে ফিরে যাব যখন গদাধর চট্টোপাধ্যায় সাধনার মাধ্যমে শ্রীরামকৃষ্ণ হয়ে উঠছেন। শ্রীরামকৃষ্ণের বিরাট ও গভীর সাধন জীবনের ভিতরে প্রবেশ করব না। কেবল একটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেই মূল আলোচনার মধ্যে ঢুকব। শ্রীরামকৃষ্ণ যখন রানি রাসমণি প্রতিষ্ঠিত দেবালয়ে জগদম্বার বালক হয়ে একটার পর একটা সাধন পর্যায় অতিক্রম করছেন তখন দেখা যেত দক্ষিণেশ্বরের বাগানে রানি রাসমণি যেখানে সাধুদের জন্য সত্র খুলেছিলেন- সেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাধুদের আগমন হত। এক-এক সময় এক-এক ভাবের সাধুরা যেন আসতে থাকতেন।

 ঠিক এইরকম একবার রামায়েত অর্থাৎ রামের ভজনাকারী বাবাজি বা সন্ন্যাসীদের আগমন হতে লাগল। এঁরা নাকি প্রত্যেকেই ছিলেন ভালো ত্যাগী ও ভক্ত। এঁদের মধ্যে জটাধারী নামে এক বাবাজির কাছে একটি রামলালার বিগ্রহ ছিল। সেই বিগ্রকে ঘিরেই তাঁর সাধনা। গোপাল যেমন বালক শ্রীকৃষ্ণ, ঠিক তেমন রামলালা হল বালক শ্রীরাম। ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের লোকে বালক বা বালিকাদের লাল বা লালী বলে সম্বোধন করেন। তাই সেই জটাধারী বালক রামকে রামলালা নামে সম্বোধন করতেন। এঁর ছোট্ট বিগ্রহ শুধু বিগ্রহ ছিল না। একেবারে জীবন্ত অস্তিত্ব ছিল। সাধক বাবাজি রাম সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। তিনি সেই মূর্তিতে রামকে জীবন্ত দেখতেন। সেই বালক রামের দুষ্টুমির কাহিনীর সঙ্গে গোপালের দুষ্টুমির কাহিনীর খুব বেশি পার্থক্য আমরা দেখতে পাব না। আমরা এই কাহিনী বর্ণনায় শ্রীরামকৃষ্ণের প্রামাণিক জীবনী গ্রন্থ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গকে অনুসরণ করব। এখানে লেখক স্বামী সারদানন্দ শ্রীরামকৃষ্ণ মুখে এই লীলাকথা যেমন শুনেছিলেন ঠিক তেমনই বর্ণনা করেছেন।

 এ প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, ‘সে বাবাজি (জটাধারী) ওই ঠাকুরটির চিরকাল সেবা করত। যেখানে যেত, সঙ্গে করে নিয়ে যেত। যা ভিক্ষা পেত রেঁধে-বেড়ে তাকে ভোগ দিত। শুধু তাই নয়, সে দেখতে পেত রামলালা সত্য সত্যই খাচ্ছে। বা কোন একটা জিনিস খেতে চাচ্ছে, বেড়াতে যেতে চাচ্ছে, আবদার করছে, ইত্যাদি! আর ওই ঠাকুরটি নিয়েই সে মত্ত থাকত।’ শুধু তাই নয়, শ্রীরামকৃষ্ণও দেখতে পেতেন রামলালার সেই লীলা। তিনি বলছেন, ‘রোজ সেই বাবাজির কাছে চব্বিশ ঘণ্টা বসে থাকতুম-আর রামলালাকে দেখতুম।’

তাঁর এই লীলাদর্শনের ফলে এক অদ্ভুত কাণ্ড হল। রামলালাও শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি আকৃষ্ট হলেন। ‘দিনের পর দিন যত যেতে লাগল, রামলালারও তত আমার ওপর পিরিত বাড়তে লাগল। আমি যতক্ষণ বাবাজির কাছে থাকি ততক্ষণ সেখানে সে বেশ থাকে -খেলাধুলা করে ; আর আমি যেই সেখান থেকে নিজের ঘরে চলে আসি, তখন সেও আমার সঙ্গে সঙ্গে চলে আসে। আমি বারণ করলেও সাধুর কাছে থাকে না। প্রথম প্রথম ভাবতুম, বুঝি মাথার খেয়ালে ওইরকমটা দেখি। নইলে তার চিরকেলে পুজো করা ঠাকুর, ঠাকুরটিকে সে কত ভালোবেসে- ভক্তি করে সন্তর্পণে সেবা করে, সে ঠাকুর তার চেয়ে আমায় ভালোবাসবে-এটা কি হতে পারে? কিন্তু ওরকম ভাবলে কী হবে? -দেখতুম, সত্য সত্য দেখতুম রামলালা সঙ্গে সঙ্গে কখনও আগে কখনও পেছনে নাচতে নাচতে আসছে। কখনও বা কোলে ওঠবার জন্য আবদার কচ্চে। আবার হয়তো কখনো  বা কোলে  করে রয়েছি- কিছুতেই কোলে থাকবে না, কোল থেকে নেমে রোদে দৌড়াদৌড়ি করতে যাবে, কাঁটাবনে গিয়ে ফুল তুলবে বা গঙ্গার জলে নেমে ঝাঁপাই জুড়বে! যত বারণ করি, ‘ওরে অমন করিসনি, গরমে পায়ে ফোসকা পড়বে! ওরে অত জল ঘাঁটিসনি, ঠান্ডা লেগে সর্দি হবে, জ্বর হবে,-সে কি তা শোনে? যেন কে কাকে বলছে! হয়তো সেই পদ্ম-পলাশের মতো সুন্দর চোখ দুটি দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ফিক ফিক করে হাসতে লাগলো,  আর আরও দুরন্তপনা করতে লাগলো বা ঠোঁট দুখানি ফুলিয়ে মুখভঙ্গি করে ভ্যাঙচাতে লাগলো। তখন সত্য সত্যই রেগে বলতুম, ‘তবে রে পাজি, রোস -আজ তোকে মেরে হাড় গুঁড়ো করে দেব!’ – বলে রোদ থেকে বা জল থেকে জোর কিরে টেনে নিয়ে আসি ; আর এ জিনিসটা ও জিনিসটা দিয়ে ভুলিয়ে ঘরের ভেতর খেলতে বলি। আবার কখনও বা কিছুতেই দুষ্টামি থামছে না দেখে চড়টা চাপড়টা বসিয়েই দিতাম। মার খেয়ে সুন্দর ঠোঁট দুখানি ফুলিয়ে সজলনয়নে আমার দিকে দেখত! তখন আবার মনে কষ্ট হত; কোলে নিয়ে কত আদর করে তাকে ভুলাতুম। এ রকম সব ঠিক ঠিক দেখতুম ও করতুম।’

‘একদিন নাইতে যাচ্ছি, বায়না ধরলে সেও যাবে! কি করি, নিয়ে গেলুম। তারপর জল থেকে আর কিছুতেই উঠবে না। যত বলি কিছুতেই শোনে না। শেষে রাগ করে জলে চুবিয়ে ধরে বললুম – তবে নে কত জল ঘাঁটতে চাস ঘাঁট, আর সত্য সত্য দেখলুম সে জলের ভিতর হাঁপিয়ে শিউরে উঠল। তখন আবার তার কষ্ট দেখে কি করলুম বলে কোলে করে জল থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসি।’ আরেকদিন রামলালাকে ভুলাবার জন্য শ্রীরামকৃষ্ণ কিছু খই খেতে দেন। সেই খইয়ে ধান ছিল তা তিনি খেয়াল করেননি। আর সেই ধানে রামলালার নরম জিভ চিরে যায়। সেখান থেকে রক্ত পড়ছে এও দেখতে পান শ্রীরামকৃষ্ণ। তখন তিনি দুঃখে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘এই মুখে মা কৌশল্যা কত ননী, সর ইত্যাদি তুলে দিয়েছেন আর আমি এমন হতভাগা যে সেই মুখে এমন কদর্য খাবার তুলে দিতে সংকোচ হল না?’ এই কথাগুলি ভক্তদের সামনে বলতে বলতে পরবর্তীকালে শ্রীরামকৃষ্ণ এত অশ্রুবর্ষণ করতেন যে ভক্তেরা অবাক হয়ে কেবল শুনতেন না তাঁদের চোখও অশ্রুপূর্ণ হয়ে উঠত।

এই বিচিত্র লীলা সাধকেরা সম্পন্ন করেন এবং ব্যক্ত করেন সাধারণ মানুষের ভক্তি বিশ্বাস বৃদ্ধির জন্য। সত্যই দেবতা কেন এমন মায়াময় রূপে ধরা দেন সাধকের কাছে এই প্রশ্নই বারংবার মনে উঠতে থাকে। শ্রীরামকৃষ্ণ যখন তাঁর ভক্তদের কাছে এই রামলালের কথা বলতেন স্মৃতিচারণ করতেন তখন সেই বিগ্রহ তাঁর ঘরেই থাকত। যার দিকে ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে ভক্তগণ ভাবতেন এই ছোট্ট একটি বিগ্রহের এত দৌরাত্ম্য? জটাধারীর রামলাল কী করে শ্রীরামকৃষ্ণ এর কাছে রয়ে গেলেন সেই কাহিনীও অতি আশ্চর্যজনক।

দক্ষিণেশ্বরে এসে রামলালা শ্রীরামকৃষ্ণ অনুরাগী হয়ে উঠলেন। ভক্ত কি কেবল ভগবানের লীলা আস্বাদনের পিয়াসী হয়? ভগবানও কোনও কোনও ক্ষেত্রে ভক্তাধীন হয়ে ওঠেন। রামলালা কীভাবে শ্রীরামকৃষ্ণের নেওটা হয়ে উঠলেন ও কীভাবে তিনি জটাধারী বাবাজির অভিমান সৃষ্টি করতেন তার বর্ণনাও শ্রীরামকৃষ্ণ দিয়েছেন। তিনি বলছেন, একেকদিন রেঁধে বেড়ে ভোগ দিতে বসে বাবাজি আর রামলালাকে দেখতে পেতেন না। তিনি তখন খুঁজতে খুঁজতে শ্রীরামকৃষ্ণের ঘরে চলে আসতেন। এসে যখন দেখতেন রামলালা সেই ঘরে খেলা করছে তখন অভিমান ভরে কত কথাই না বলতেন। বলতেন, ‘আমি এত করে রেঁধে বেড়ে তোকে খাওয়াব বলে খুঁজে বেড়াচ্চি, আর তুই কি না এখানে নিশ্চিন্ত হয়ে ভুলে রয়েছিস! তোর ধারাই ঐরূপ, যা ইচ্ছা তাই করবি, মায়াদয়া কিছুই নেই! বাপ-মাকে ছেড়ে বলে গেলি, বাপটা কেঁদে কেঁদে মরে গেল, তবুও ফিরলি না- তাকে দেখা দিলি না!’ এই রকমে সব কত কী বলে বাবাজি রামলালাকে খাওয়াতেন।

রামলালা শ্রীরামকৃষ্ণকে ছেড়ে কোথাও যাবে না, তাই বাবাজিরও দক্ষিণেশ্বর ছেড়ে কোথাও যাওয়া হয় না। এরকম বেশ কিছুদিন চলল। একদিন বাবাজি এসে শ্রীরামকৃষ্ণের হাতে রামলালাকে দিয়ে বললেন, ‘রামলালা আমাকে কৃপা করে এমনভাবে দর্শন দিয়েছেন যে, আমি যেমন চাইতাম তেমন করেই তাঁকে দেখতে পেতাম। তিনি আমার পিপাসা মিটিয়ে দিয়েছেন। এখন তিনি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবেন না স্থির করেছেন। তাই তাঁকে তোমার হাতে দিয়ে আমি চললুম। আমার মনে এখন কোনও দুঃখ নেই। তোমার কাছে সুখে আছে জেনেই আমি সন্তুষ্ট। তাঁর সুখেই আমার সুখ।’

সেই থেকে রামলালা শ্রীরামকৃষ্ণ সঙ্গেই ছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর ত্যাগ করে কলকাতায় এলে রামলাল বহুদিন মন্দিরেই পূজা গ্রহণ করেন। শোনা যায় কোনও সময় সেই মূল্যবান বিগ্রহ চুরি হয়ে যায়। কিন্তু রামলালার স্মৃতি অগণিত ভক্তের মনজগতে চিরকাল স্থির হয়ে প্রতিভাত হতে থাকে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *