সপ্তর্ষি সরকার, ধূপগুড়ি: লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। বহু ব্যবহৃত এই প্রবচনটা যে বারবার সত্যি হলেও, তাতে হঁশ ফিরছে না জলপাইগুড়ির (Jalpaiguri) ডুয়ার্সের (Dooars)। মানুষের লোভ কোন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, তা যদি কেউ কিছুটা দেখতে চান তাহলে একবার অন্তত ঢুঁ দিতে হবে ডুয়ার্সের তথাকথিত ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশনগুলোতে।
ওদলাবাড়ি, মূর্তি, ধূপঝোরা, লাটাগুড়ির মতো এলাকাগুলিতে যাঁরা প্রমোদভ্রমণে যান তাঁরা যেটা দেখতে পান না অথবা দেখেও বুঝতে চান না, তা হল প্রকৃতি, বিশেষ করে নদীর ওপর লোভী মানুষের আগ্রাসন। জলঢাকা, গাঠিয়া, ডায়নার ভয়ানক বানের পরেও এই এলাকায় একচুল কমেনি মানুষের লোভ। চলছে বহালতবিয়তে বালি-পাথর তোলা, নদীর বুকে রিসর্টের ব্যবসা, সর্বোপরি পর্যটন ব্যবসার নামে নদীর ওপর জঘন্য অত্যাচার। দক্ষিণ ধূপঝোরায় মূর্তি নদীর পাড়ে সদ্য জল নেমে যাওয়া জমিতে পোষ্য গবাদিপশুকে ঘাস খাওয়ানোর ফাঁকে বর্ষীয়ান নুরউদ্দিন মিয়াঁর বক্তব্য, এই যে রিসর্টগুলো দেখছেন তার প্রায় সবই দক্ষিণবঙ্গ বা ভিনরাজ্যের মালিকদের। এঁরা সবাই এখানে মোটা টাকা ঢেলে কামাই করতে এসেছেন। এই নদী, এই বন বা এখানকার মানুষের ভালোমন্দে এঁদের কিছুই যায় আসে না। এঁরা মূর্তি নদীকে চেনেনও না, বোঝেনও না।
বাইরের মালিকরা যখন ব্যবসা এবং মুনাফার লোভে ডুয়ার্সের নদী লুট করে পকেট ভরতে ব্যস্ত তখন স্থানীয় মানুষের একাংশের ‘দারিদ্র্য’ এবং কর্মহীনতা কাজে লাগিয়ে বালি-পাথরের চোরাকারবার কম ক্ষতি করছে না। ক্রান্তি ব্লকের কুমলাই গ্রাম পঞ্চায়েত, মেটেলি ব্লকের মাটিয়ালি ধূপঝোরা বা ওদলাবাড়ির গ্রামের অলিগলি দিয়ে দাপিয়ে বেড়ানো ট্র্যাক্টর-ট্রলিগুলিতে বালি-পাথর বোঝাই হচ্ছে রোজ। নদীর পাড়ে বড় ডাম্পার পৌঁছালে লোকের চোখে পড়তে পারে বলে ট্রলিতে করে বালি-পাথর এনে এক জায়গায় জড়ো করে সেখান থেকে ডাম্পারবোঝাই হয়ে পাচার হয়ে যাচ্ছে বাইরে। এই কাজে বাইরের নয়, বরং স্থানীয় ক্ষমতাবান কেষ্টবিষ্টুদেরই পকেট উপচে পড়ছে। নদীর সর্বনাশ করে চলা বালি-পাথরের কারবারিদের ঢাল দিন আনি দিন খাই স্থানীয় শ্রমিকরা। এনিয়ে কেউ প্রতিবাদ করলেই ‘গরিব মানুষ করে খাচ্ছে’ যুক্তিকে সামনে এনে রেহাই পান আড়াল থেকে কারবারের মুনাফাখোররা।
বছরখানেক আগে একবার মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষোভ প্রকাশের পর নদী দখল করে গড়ে ওঠা বেআইনি রিসর্টের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও পুলিশের অভিযান যে পলির নীচে চাপা পড়েছে সেটা নেওড়া, মূর্তি বা ওদলাবাড়িতে ঘিস নদীর পাড়ে দাঁড়ালেই বোঝা যায়। গ্রাহকদের জন্যে নদীর বুকে খানাপিনার আয়োজনেও পিছপা হন না রিসর্ট মালিকরা। সেইসঙ্গে মূর্তি বা নেওড়ার জলে নামা বা রাতেরবেলা জঙ্গল সাফারির মতো বিপজ্জনক ‘প্রমোদের’ ব্যবস্থাও করে দিচ্ছে অনেক রিসর্ট কর্তৃপক্ষ। গত এক দশকের কম সময়ে ওদলাবাড়ি ঘিস নদীর ধারে একাধিক রিসর্ট, বিলাসবহুল হোটেল এবং ফার্ম হাউস গজিয়ে উঠলেও স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েতের সেগুলির ট্রেড লাইসেন্স, প্রপার্টি ট্যাক্স, এমনকি বিল্ডিং প্ল্যান নেওয়ার কোনও বালাই নেই। টেলিসিরিয়াল থেকে টলিউডের তারকারা, এমনকি রাজনৈতিক ক্ষমতাবান অনেকেই দিনে-রাতে যাতায়াত করেন ঘিস নদীর প্রায় বুকের ওপর নির্মিত এই রিসর্ট বা ফার্ম হাউসগুলিতে। ওদলাবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান মৌমিতা ঘোষের কথায়, ‘ঘিস নদী পাড়ের তুড়িবাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা বেশকিছু বিলাসবহুল হোটেল, রিসর্ট, ফার্ম হাউস এবং হোমস্টে সম্পর্কে আমরা সম্পূর্ণ অন্ধকারে। এরা কেউই গ্রাম পঞ্চায়েতের কোনও অনুমতি বা এনওসি নেওয়া, খাজনা দেওয়া কিছুই করেনি। আমরা এদের বিরুদ্ধে নোটিশ পাঠাব।’
এই বিশাল রিসর্ট, হোমস্টে বা ফার্ম হাউসগুলো কোনওটাই রাতারাতি গড়ে ওঠেনি। তা সত্ত্বেও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে এদের বা এসবে দিনের পর দিন চলা কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কোনও তথ্য না থাকাটা যতটা বিস্ময়ের ততটাই হাস্যকর। এলাকায় কান পাতলেই জানা যায়, শুধু স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত বা প্রশাসনই নয়, সেচ দপ্তর, জলসম্পদ দপ্তর, এমনকি ভূমি দপ্তরের নিয়মকানুন বা আইন কিছুই মানেনি ঘিস, নেওড়া, মূর্তি নদীর পাড় ঘেঁষে গজিয়ে ওঠা বেশিরভাগ রিসর্ট। কোথাও এদের দখলে রয়েছে খাসজমি তো কোথাও নদী চর। কোথাও শিকোস্তি জমি দখল করে চলছে রিসর্ট। অনেকক্ষেত্রে আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তপশিলি আদিবাসী সম্প্রদায়ের জমি ঘুরপথে হাতিয়ে তৈরি হয়েছে প্রমোদ রেস্তোরাঁ, রিসর্ট, ফার্ম হাউস।
জলঢাকা ইতিমধ্যেই মানুষের আগ্রাসনের জবাব দিয়েছে বিপজ্জনকভাবে। আগামীদিনে যদি একই ভাষায় ঘিস, নেওড়া বা মূর্তি রুদ্ররূপ ধারণ করে বসে তখন মানুষ হয়তো নিজেদের ক্ষতির হিসেবে বসবে। দিনের পর দিন নদীর যে ক্ষতি করা হয়েছে তার হিসেব এখনকার মতো তখনও হয়তো উপেক্ষিতই থেকে যাবে।
