সপ্তর্ষি সরকার, ধূপগুড়ি: ‘মর্যাদা’ সিনেমায় চিরঞ্জিতের মুখে দারুণ হিট সেই ডায়লগ মনে আছে? ‘বৌ গেলে বৌ পাওয়া যায়। কিন্তু মা গেলে মা পাওয়া যায় না রে পাগলা…।’ সংলাপ হিসেবে এটি কেমন তা নিয়ে অনেকের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু এটা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই যে এই সংলাপ আমাদের সবার জীবনের সঙ্গেই আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে। ওঁদের জীবনেও। ষাট ছুঁইছুঁই মা যাতে হারিয়ে না যান তাই তাঁর ছবি হাতে নিয়ে ওঁরা তিন ভাই হাটবাজার, অলিগলি চষে ফেলছেন। উদ্দেশ্য, বিবাগী মাকে বাড়ি ফেরানো। আত্মীয়পরিজন থেকে পরিচিত সবার বাড়িতে খোঁজ করেও সাফল্য মেলেনি। শুক্রবার বিকেলে কান্নাভেজা চোখে জলপাইগুড়ি (Jalpaiguri) ধূপগুড়ি (Dhupguri) বাজারে মায়ের ছবি হাতে ঘুরে বেড়ানো মেজো ছেলে নির্মল দাস বললেন, ‘বাবা ও আমরা তিন ভাই বাড়ি ছিলাম না। তিন পুত্রবধূর কারও সঙ্গে হয়তো মায়ের কথা কাটাকাটি হয়েছিল। এরপর থেকেই মাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা গরিব হলেও মাকে ছাড়া থাকার কথা তিন ভাই স্বপ্নেও ভাবতে পারি না। যে কোনও মূল্যে তাঁকে বাড়ি ফেরাতেই হবে।’ মায়ের বিবাগী হওয়া নিয়ে বাড়িতে স্ত্রীদের সঙ্গেও যে তিন ভাইয়ের সম্পর্ক চূড়ান্ত টানাপোড়েনে চলছে তাও তিনজনে জানাতে ভোলেননি।
সুশীলা দাস ফালাকাটা (Falakata) ব্লকের ময়রাডাঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েতের যোগেন্দ্রপুর তিন মাইল এলাকার বাসিন্দা। স্বামী ছাড়াও তিন ছেলে, বৌমা, নাতি-নাতনি নিয়ে তাঁর সংসার। বৃদ্ধ স্বামী কৃষিকাজে যুক্ত। তিন ছেলেই শ্রমিকের কাজ করেন। অভাবের সংসারে টানাটানি সঙ্গী হলেও আজও এক ভিটেয় একান্নবর্তী পরিবারে সবার বাস। প্রৌঢ়ার ছেলেদের বক্তব্য অনুসারে, গত বৃহস্পতিবার সকালে তিন ভাই এবং বাবা কাজে বেরিয়ে যান। এরপরই পারিবারিক কোনও বিষয়ে বৌমাদের সঙ্গে সুশীলার কথা কাটাকাটি হয়। এর জেরেই তিনি বাড়ি ছাড়েন। বেলা গড়িয়ে দুপুর হওয়ার পরেও ঠাকুমা বাড়ি না ফেরায় নাতিরা গিয়ে ঘটনাটি বাবা–কাকাদের জানায়। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা বাড়ি ফিরে সমস্তটা শোনার পর খোঁজ শুরু হয়। ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় কাটার পরেও খোঁজ না মেলায় তিন ছেলে আপাতত মায়ের ছবি হাতে পথে নেমেছেন।
এদিন সকাল থেকে এথেলবাড়ি, গয়েরকাটা হয়ে তিন ছেলে কমল, নির্মল ও শ্যামল ধূপগুড়িতে পৌঁছান। নিজেরা খোঁজখবর করলেও পরিবারের সদস্যরা এখনও এনিয়ে পুলিশে যোগাযোগ করে উঠতে পারেননি। বড় ছেলে কমল বললেন, ‘আমরা নিশ্চিত যে আমাদের তিন ভাইয়ের স্ত্রীদের কারও কোনও কথায় মায়ের মনে দারুণ আঘাত লাগার কারণেই তিনি বাড়ি ছেড়েছেন। এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। পুলিশ দিয়ে মাকে খোঁজার চাইতে আমরা তিন ভাই মায়ের অভিমান ভাঙিয়ে বাড়ি নিয়ে যাব বলেই বেরিয়েছি।’
পরিবারের লোকেরা না গেলেও এলাকার মানুষ বিষয়টি স্থানীয় গ্রামীণ পুলিশ সহ থানার নজরে এনেছেন বলেই প্রৌঢ়ার ছেলেরা জানান। মায়ের ছবি হাতে খোঁজ করতে গিয়ে ছেলেদের কেঁদে ফেলার করুণ ছবি ধূপগুড়ি বাজারের বহু মানুষের মনেও ছাপ ফেলেছে। আজকের সমাজে ছেলে–পুত্রবধূর অত্যাচারে বৃদ্ধ বাবা–মায়ের বাড়ি ছাড়া হওয়ার খবর খুবই সাধারণ। এই পরিস্থিতিতে এই ঘটনাটি সবার মনে ছাপ ফেলেছে। সমাজবিদ্যার গবেষক ডঃ সুপ্রতীক চৌধুরীর কথায়, ‘শহুরে নিউক্লিয়ার পরিবারের তুলনায় গ্রামীণ একান্নবর্তী বড় পরিবারগুলির গঠনগত ফারাক রয়েছে। গ্রামীণ একান্নবর্তী পরিবারে আবেগের জায়গাটা অনেক বড়। সেই আবেগ থেকেই হয়তো প্রৌঢ়া বিবাগী হয়েছেন আবার সেই আবেগের তাড়ানাতেই তিন ছেলে চোখের জল ফেলে মায়ের খোঁজে হন্যে হচ্ছেন।’
