লাটাগুড়ি: অভাবের দিনে শেষ ভরসায় যে জমির ভূমিকা ‘সম্পদ’, সেই জমিই এখন একপ্রকার ‘বোঝা’। বিঘা বিঘা জমির মালিক হয়েও কার্যত কপর্দকশূন্য তাঁরা। জলপাইগুড়ি (Jalpaiguri) জেলার ক্রান্তি (Kranti) ব্লকের চাঁপাডাঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েতের তিস্তা ও ধরলা নদীর বন্যাকবলিত এলাকার প্রায় তিনশো পরিবার আজ মুখোমুখি এই বাস্তবতার। বর্ষা এলেই জলবন্দি জীবন কাটে তাঁদের। অতীতে চারফসলি জমির চাষবাসও হয় না। সব মিলিয়ে অভাব যেন সারাবছরের সঙ্গী।
জমি, বাড়ি বিক্রি করে অন্যত্র বসববাসের ‘মুক্তি’র উপায় রাখেনি ভবিতব্য। এমনকি মেয়ের বিয়ে, চিকিৎসা বা সংসারের জরুরি প্রয়োজনে জমি বিক্রি করে অর্থ জোগাড়ের পথও হয়েছে বন্ধ। কারও বিঘার পর বিঘা জমি থাকলেও মিলছে না কোনও ক্রেতা। ভূমি দপ্তরের হিসাবেই, গত ১০-১২ বছর ধরে এই এলাকায় কার্যত বন্ধ জমি কেনাবেচা।
চাঁপাডাঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েতের (Chapadanga Gram Panchayat) মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা, ধরলা সহ একাধিক নদী। ২০১৪ সালে তিস্তার বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে গোটা এলাকা। এরপর রাজ্য সরকারের সেচ দপ্তর প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ করলেও স্থায়ী সমাধানের মুখ দেখেননি স্থানীয়রা। প্রতি বছর বর্ষা শুরু হতেই তিস্তা ও ধরলার মিলনস্থল দিয়ে নদীর জল ঢুকে পড়ে গ্রাম পঞ্চায়েতের বিস্তীর্ণ এলাকায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বাসুসুবা, মাস্টারপাড়া, সেনপাড়া ও কেরানিপাড়ার বাসিন্দারা। অনেক বাড়িতে মাসের পর মাস জল দাঁড়িয়ে থাকে। যাতায়াতের ভরসা তখন থার্মোকলের ভেলা। পানীয় জলের সংকট রোজকার সঙ্গী তাঁদের। ঘরের মায়া কাটিয়ে বহু পরিবার বাধ্য হয় তিস্তার বাঁধের উপর আশ্রয় নিতে। স্থানীয় সুবোধ বর্মন ও অশোক রায় জানান, প্রতি বছর ছবিটা একই। জলের নীচেই কেটে যায় বছরের পাঁচটা মাস- স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। একসময়ে কৃষিনির্ভর এই এলাকায় এখন বছরের বড় একটা সময় চাষাবাদ অসম্ভব। ঘরবাড়ি নির্মাণের পরও তা টেকানো কঠিন। যাঁদের সামর্থ্য রয়েছে, তাঁরা অন্যত্র চলে গেলেও ফেলে যাওয়া জমি বিক্রির সুযোগ নেই।
বাসুসুবা সংলগ্ন সেনপাড়ার রঞ্জিত মণ্ডল বর্তমানে ময়নাগুড়ির সিঙ্গিমারিতে থাকেন। তাঁর কথায়, ‘বাসুসুবায় আমার কয়েক বিঘা জমি রয়েছে। ছেলে সঞ্জিত কেরলে শ্রমিকের কাজ করে। জমিটা বিক্রি করে ছেলেকে ব্যবসা করার জন্য পুঁজি দেওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সব নথিপত্র ঠিক থাকলেও কেউ জমি কিনতে চাইছে না। কারণ সবাই জানে, বছরের বেশিরভাগ সময় ওই এলাকা জলের তলায় থাকে।’ কেরানিপাড়ার কৃষক ভাদু রায়ের আক্ষেপ, ‘এক সময় এই জমিতে বছরে চারটি ফসল হত। জমির দামও ছিল ভালো। কিন্তু গত ১৪-১৫ বছর ধরে প্রতি বর্ষায় তিস্তার জল গ্রামে ঢুকছে। এখন ফসল ফলানো তো দূরের কথা, গ্রামে থাকাই দায়।’
স্থানীয়দের দাবি, মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরের মৌলানি গ্রামে যেখানে একই ধরনের কৃষিজমির দাম বিঘাপ্রতি ২০ থেকে ২২ লক্ষ টাকা, সেখানে চাঁপাডাঙ্গার জমি নামমাত্র দামেও বিক্রি করা যাচ্ছে না। তাই, স্থায়ী বন্যা নিয়ন্ত্রণ হলে জমির মূল্য ফেরার আশাতেই দিন গুনছে চাঁপাডাঙ্গার শতাধিক পরিবার।
স্থানীয় বিধায়ক শুক্রা মুন্ডার আশ্বাস, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকার স্থায়ী সমাধান হয়নি। বর্ষাকালে বড় ধরনের কাজ করা সম্ভব নয়। বর্ষা শেষে এনিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।’

