উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গে রেলের জমি দখলমুক্ত করার তৎপরতার মধ্যেই উঠে এল সারা দেশের রেলের জমি (Railway Land) জবরদখলের এক উদ্বেগজনক সার্বিক চিত্র। তথ্যের অধিকার আইন (RTI)-এর আওতায় করা একটি আবেদনের জবাবে রেল বোর্ডের দেওয়া তথ্য এবং সংসদে পেশ করা পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বিগত পাঁচ বছরে দেশে রেলের জমি দখলের প্রবণতা প্রায় ৩২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের এক হাজার হেক্টরেরও বেশি রেলের জমি বর্তমানে বেআইনি দখলদারদের কব্জায় রয়েছে।
RTI-এর জবাবে রেল বোর্ড (Indian Railways) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ভারতীয় রেলের মোট ১,০৬৮.৫৪ হেক্টর জমি অবৈধভাবে দখল হয়ে রয়েছে। শতাংশের হিসেবে এটি রেলের মোট ৪.৯৯ লক্ষ হেক্টর জমির মাত্র ০.২১ শতাংশ মনে হলেও, বাস্তবে এই জমির পরিমাণ বিশাল।
এই পরিমাণ জমিতে আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামের (বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিকেট স্টেডিয়াম, যা প্রায় ২৫.৫ হেক্টর বা ৬৩ একর জুড়ে অবস্থিত) মতো প্রায় ৪২টি স্টেডিয়াম তৈরি করা সম্ভব। অন্যভাবে হিসাব করলে, এই বেদখল হওয়া জমিতে ফিফা (FIFA) মানের প্রায় ১,৪৯৬টি ফুটবল মাঠ এঁটে যেতে পারে।
রেল বোর্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিগত অর্থবর্ষগুলোতে রেলের জমি দখলের চিত্রটি ছিল নিম্নরূপ:
| অর্থবর্ষ | অবৈধ দখলে থাকা জমি (হেক্টর) |
| ২০২০-২১ | ৮১০.৩১ |
| ২০২১-২২ | ৭৮২.৮১ (সামান্য হ্রাস) |
| ২০২২-২৩ | ৮০০-র বেশি |
| ২০২৩-২৪ | ১,০৭৮.৫৫ (এক বছরেই বৃদ্ধি প্রায় ২৬৮ হেক্টর) |
| ২০২৪-২৫ | ১,০৬৮.৫৪ (সামান্য হ্রাস) |
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবর্ষে জবরদখলের পরিমাণ সামান্য কমলেও পরবর্তী বছরগুলোতে তা হু হু করে বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ২৬৮ হেক্টর নতুন জমি বেদখল হয়ে যায়, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
সংসদে রেল মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে রেল মাত্র ৯৮.০২ হেক্টর জমি দখলমুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। অর্থাৎ, যে হারে নতুন করে জমি দখল হচ্ছে, সেই তুলনায় জমি উদ্ধারের গতি অত্যন্ত ধীর।
রেল মন্ত্রক জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া এই জমিগুলো নতুন রেললাইন স্থাপন, মালবাহী ট্রেনের টার্মিনাল, যাত্রী টার্মিনাল, ওয়ার্কশপ এবং অন্যান্য রেল পরিকাঠামো নির্মাণে ব্যবহার করা হবে। এ ছাড়া, যে সমস্ত জমি অবিলম্বে রেলের প্রয়োজন নেই, সেগুলো ‘রেল ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ (RLDA)-র মাধ্যমে বাণিজ্যিক উন্নয়নের জন্য হস্তান্তর করা হবে।
RTI আবেদনকারী বিগত ২৫ বছরের জমি দখলের তথ্য জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রেল বোর্ড জানিয়েছে, তারা কেবল বিগত ৫ বছরের তথ্য সংরক্ষণ করে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়।
এমনকি কোন রাজ্যে সবচেয়ে বেশি রেলের জমি দখল হয়ে রয়েছে, সেই নির্দিষ্ট রাজ্যভিত্তিক বা জোনভিত্তিক তথ্যও কেন্দ্রীয়ভাবে রেল বোর্ডের কাছে নেই। বোর্ড জানিয়েছে, এই ধরনের তথ্যের জন্য সংশ্লিষ্ট জোনের পাবলিক ইনফরমেশন অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যখন নতুন রেললাইন, মালবাহী করিডর, স্টেশন পুনর্নির্মাণ এবং পরিকাঠামো সম্প্রসারণের জন্য বিপুল জমির প্রয়োজন, তখন এই বিশাল পরিমাণ অবৈধ দখলদারি ভবিষ্যতের প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় স্তরে পূর্ণাঙ্গ তথ্যের অভাব এই সমস্যার সমাধানকে আরও জটিল করে তুলছে।

