অনুষ্কা বর্মন, শিলিগুড়ি: বেলা তখন প্রায় ১টা। গনগনে রোদ পিছু ছাড়ছে না আকাশের। সোলারচালিত ট্যাংক ঘিরে জমছে কলসি, ড্রাম, বালতি। কখন জল বন্ধ হয়, কেউ জানে না। উঠোনে গাছের ছায়ায় বসে কার্জি আর সাধনা (দুজনেরই নাম পরিবর্তিত) জীবনের অন্ধকার সময়ের কথা শোনাচ্ছিলেন। পাচারের ‘ফাঁদ পাতা ভুবন’ পেরিয়ে কার্জির স্বপ্ন, ‘বাবা মারা যাওয়ার পর সংসার সামলাতে আমি যে স্কুলে পড়াশোনা ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছি, আমার মেয়ে সেই স্কুলেই পড়ুক।’ চার মাসের প্রাচীর দিকে তাকিয়ে সেই স্বপ্নই বুনছিলেন তিনি।
চারদিকে তেরঙা, মাইকে এআর রহমানের ‘বন্দে মাতরম’। অথচ স্বাধীনতার আট দশকেও দার্জিলিংয়ের পাকদিণ্ড থেকে ডুয়ার্সের চা বলয়, অধিকাংশ শ্রমিক লাইনে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানীয় জল ও বাসস্থানের ন্যূনতম অধিকার অধরা। কাকভোরে ফাটা গোড়ালিতে ভর করে রোজনামচা শুরু হয়। সবুজ বাগিচায় শ্রমিকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুটি পাতা একটি কুঁড়ি তোলেন। ২৫০ টাকার হাজিরায় হাঁড়িতে চাল ফোটানো দায়। সংবিধান স্বীকৃত অধিকার পেটের খিদের কাছে মাথা নোয়ায়।
দালালচক্র এই অভাবেরই সুযোগ নেয়। উন্নত জীবন, শহরে ভালো মাইনের কাজ, নার্সিংয়ের প্রশিক্ষণ বা ভালো বিয়ের মিথ্যে স্বপ্ন দেখিয়ে বাগানের অভাবী মেয়েদের নিশানা করা হয়। মুক্তির স্বপ্নের আড়ালে অনেকেই দিল্লির বদ্ধ ফ্ল্যাট বা ভিনরাজ্যের অন্ধকার গলিতে আধুনিক ‘ক্রীতদাসে’ পরিণত হন (Human Trafficking)। নকশালবাড়ির অটল চা বাগানের সাধনা বলে চলেন, ‘সালটা ২০২২। আমার তখন ১৮-ও হয়নি। দাদু দিল্লিতে মাসিক ভালো টাকার বিনিময়ে কাজের খোঁজ দিলেন। অভাবের সংসারে সেখান থেকে প্রতি মাসে টাকা পাঠাতে পারব। এর পিছনে কী চক্রান্ত লুকিয়ে তখনও বুঝিনি।’ দিল্লিতে সারাদিন ঘরে আটকে রেখে তিন-চারদিনের খোরাক হিসেবে এক গ্লাস জল ও একটি পাউরুটি দেওয়া হত। ফোনও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে এক সংস্থার উদ্যোগে নকশালবাড়ি ও দিল্লি পুলিশের সাহায্যে সাধনা ও কার্জির বাড়ি ফেরা।
নাগরাকাটার এক বাগানের ন’বছরের মেয়েও একই প্রলোভনে বাড়ি ছেড়েছিল। ১৫ বছর পর অমৃতসর ও নাগরাকাটা পুলিশের সহযোগিতায় সম্প্রতি ওই তরুণী মা-বাবার কাছে ফিরেছেন। শৈশব হারিয়েছে, মা-বাবা মেয়ের বেড়ে ওঠা দেখেননি। এমন বহু বাবা–মাই আজও মেয়ের ফেরার অপেক্ষায়। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর সাম্প্রতিক রিপোর্টে উত্তরবঙ্গের দারিদ্র্যক্লিষ্ট চা বাগানগুলিকে পাচারকারীদের মৃগয়াক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মহিলা শ্রমিকদের শারীরিক যন্ত্রণাও উপেক্ষিত। সকালে চার ঘণ্টা বাগানে কাজ, বাড়ির কাজ সেরে দুপুরে ফের বাগানে ফেরা। ঋতুকালীন যন্ত্রণা, কোমর ও পায়ের ব্যথার মধ্যেই দিন কাটে তাঁদের। সুনীতা মান্ডি বলেন, ‘আমাদের জীবনটা এমনই। বাড়ির লোক এই কষ্ট বুঝলে ভালো, না বুঝলে আর…। মাতৃত্বকালীন ছুটি তিন মাসেই শেষ। তারপর বাচ্চা আর পিঠে চা-এর ঝুড়ি নিয়ে কাটে সারাদিন। রোদ, ঝড়-বৃষ্টি? পরোয়া করলে আমাদের অন্তত চলে না।’ দীপঙ্কর লোহার এই বাগানেরই বাসিন্দা, ‘এই ক’টা টাকা হাজিরায় মা-বাবা কীভাবে পড়াবে। অনেকদিন সবজি-তেল কেনার টাকাই থাকে না। বাগানে দু’একটা মাধ্যমিক স্কুল থাকলে উপকার হত। পড়ার জেদটা পায় না বলেই অনেকে না বুঝে ভুল পথে পা বাড়ায়।’
তবুও এরই মাঝে জীবন প্রাণভরে শ্বাস নেয়। হাতি-চিতাবাঘের ভয়, ভাঙা রাস্তা ও অনুন্নয়নের মধ্যেও মোহরগাঁও-গুলমার দশম শ্রেণির মুন্নি, প্রীতিরা সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া ও আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখে। বাতাসে ভেসে আসে, ‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে…’

