অরুণ ঝা, ইসলামপুর: রাজা ভীম প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম খুনে (Headmaster Homicide Case) দুজন গ্রেপ্তার (Arrest) হলেন। তাঁদের মধ্যে এক শিক্ষিকাকে মূল ষড়যন্ত্রকারী বলে পুলিশ দাবি করেছে। তদন্তে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে। মৃতের স্ত্রীর আগের ও রবিবারের বয়ানেও একাধিক অমিল ধরা পড়ছে। খুনের পর দিল্লিতে পালিয়ে যাওয়া শিক্ষিকার ঘনিষ্ঠ বন্ধুকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ধৃত শিক্ষিকার নাম মিন্নতা পারভিন। তিনি একটি এসএসকের শিক্ষিকা। ইসলামপুর শহরের বিবেকানন্দপাড়ায় বাড়িভাড়া নিয়ে তিনি থাকতেন। সেখান থেকেই পুলিশ রবিবার তাঁকে গ্রেপ্তার করে। অন্যদিকে, দিল্লি থেকে মোশারফ ওরফে লালাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি ইসলামপুরের অমলঝাড়ি এলাকার বাসিন্দা। রবিবার তাঁকে দিল্লির আদালতে পেশ করে ট্রানজিট রিমান্ডের আবেদন জানানো হয়েছে। মিন্নতাকে এদিন ইসলামপুর আদালতে পেশ করা হয়। বিচারক তাঁকে পাঁচদিনের পুলিশ হেপাজতের নির্দেশ দিয়েছেন বলে সরকারি আইনজীবী অসীম পারভেজ জানিয়েছেন।
চলতি মাসের ৮ তারিখ সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে শ্রীকৃষ্ণপুরে ২৭ নম্বর জাতীয় সড়কে নজরুলকে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে গুলি করে খুন করা হয়। শুটাররা বাইকে চম্পট দেয়। এবার তদন্তে প্রশ্ন উঠছে, একজন শিক্ষিকা কেন এমন খুনের ছক ফাঁদলেন? নজরুলের সঙ্গে কী ঘটেছিল? কেন রেইকি করে সুপারি কিলার দিয়ে তাঁকে খুন করা হল? খুনের মোটিভই বা কী ছিল?
সরকারি আইনজীবী বলেন, ‘লালাকে এই কাজের জন্য মিন্নতা টাকা দিয়েছিল।’ তদন্তে লক্ষ লক্ষ টাকার লেনদেনের তত্ত্ব যেমন উঠে এসেছে, তেমনই ‘ব্ল্যাকমেল’ তত্ত্বও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। খুনের দিনই পুলিশ সুপার রাকেশ সিং নজরুলের বাড়িতে গিয়ে তাঁর মোবাইল ফোন তদন্তের জন্য নিয়ে যান। ওই মোবাইল থেকে পাওয়া তথ্য তদন্তে সহায়ক হয়েছে বলেও জানা গিয়েছে।
তদন্তকারীদের এক কর্তা জানিয়েছেন, ধৃত লালা শুটার নয়। লালার সঙ্গে তৃতীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে মিন্নতার যোগাযোগ হয়েছিল বলেও তদন্তে উঠে এসেছে। সেই ব্যক্তিকেও খোঁজার চেষ্টা চলছে। ‘ব্ল্যাকমেল’ কে কাকে করছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে তদন্তকারীরা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছেন।
নজরুলের খুনের দিন তাঁর স্ত্রী রূপসানা খাতুন বারবার দাবি করেছিলেন, ‘আমার স্বামীর কোনও শত্রু ছিল না।’ এদিন তাঁর বক্তব্য বদলে যায়। রূপসানা বলেন, ‘মিন্নতা আমার স্বামীর কাছে আসতেন। উনি নিজেই শিক্ষিকা বলে আমি প্রথমে গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু মিন্নতা পাঁচবার আমার কাছে টাকা চাইতে আসেন। এমনকি সুদেও টাকা জোগাড় করে দিতে বলেছিলেন। যা আমি পারিনি। একবার চার লক্ষ টাকার হিসেব মেলাতে গিয়ে আমার স্বামী তাঁকে টাকা দিয়েছেন কি না বলে আমি মিন্নতার কাছে জানতে চাই। জবাবে মিন্নতা বলেন, তোমার স্বামীই উলটে আমার কাছ থেকে টাকা নিয়েছে। তারপর থেকেই মিন্নতা আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করে দেন।’ রূপসানার আরও দাবি, ‘ছয় মাস আগে থেকেই আমি মিন্নতার অভিসন্ধি টের পাচ্ছিলাম। তদন্তের সময় পুলিশকে ওর নাম বলেছিলাম। আমার এবং মেয়ের গয়না বিক্রি করে আমার স্বামী মিন্নতাকে টাকা দেন। আমি দোষীদের সকলের ফাঁসি চাই।’
এই বয়ানের পরই তদন্তে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। নজরুল কেন লক্ষ লক্ষ টাকা একজন এসএসকে শিক্ষিকাকে দিয়েছিলেন? নজরুল তাঁর কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন বলে মিন্নতা কেন দাবি করেছিলেন? সেই টাকার লেনদেনের সঙ্গে খুনের কী যোগ রয়েছে, তা পুলিশ খতিয়ে দেখছে।
পুলিশ সুপার রাকেশ সিং বলেন, ‘মিন্নতাই মূল মাস্টার মাইন্ড। তঁার সহযোগী হিসেবে দিল্লি থেকে মোশারফ নামে একজনকে এদিন গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি আরও যারা এই ঘটনার পিছনে রয়েছে এবং শুটারকে আমরা চিহ্নিত করতে পেরেছি। খুনে ব্যবহৃত বাইকটিও চিহ্নিত করা হয়েছে। দ্রুত বাকিদেরও গ্রেপ্তার করা হবে। তদন্তে একাধিক তথ্য আমরা পেয়েছি। সবটাই যাচাই করে দেখা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থেই সেই বিষয় নিয়ে কিছু বলা সম্ভব নয়।’
খুনের ঘটনায় ‘সম্পর্কের টানাপোড়েন’ নিয়েও একাধিক তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে। ‘সম্পর্কের জটিলতা’ ও ‘ব্ল্যাকমেল তত্ত্ব’ শেষপর্যন্ত তদন্তকে কোনদিকে নিয়ে যায়, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।

