হরিশ্চন্দ্রপুর: ক্ষমতার অলিন্দে বড়সড় পালাবদল ঘটলেও মালদা জেলার হরিশ্চন্দ্রপুরে সদ্য প্রাক্তন হয়ে যাওয়া তৃণমূল নেতাদের একাংশের দাদাগিরি, তোলাবাজি ও দুষ্কৃতীরাজ যেন কিছুতেই থামছে না। এবার হরিশ্চন্দ্রপুর থানা থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে সদর এলাকার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন মার্কেটে এক পানের দোকানদারকে মারধর, দোকান ভাঙচুর এবং ক্যাশ বাক্স থেকে হাজার হাজার টাকা লুঠ করার অভিযোগ উঠল খোদ শাসক দলের যুব নেতাদের বিরুদ্ধে (Harishchandrapur TMC Extortion)। আক্রান্ত ব্যবসায়ীর দাবি, হরিশ্চন্দ্রপুরের সদ্য প্রাক্তন মন্ত্রী তজমুল হোসেনের ঘনিষ্ঠ যুব তৃণমূল সভাপতির ভাই ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরাই এই তাণ্ডব চালিয়েছে। ঘটনার হাড়হিম করা সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হতেই হরিশ্চন্দ্রপুর জুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ও রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে (যদিও ভিডিওর সত্যতা যাচাই করেনি উত্তরবঙ্গ সংবাদ)।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, হরিশ্চন্দ্রপুর সদর এলাকার বাসস্ট্যান্ড লাগোয়া মার্কেটে সুকুমার সাহা নামে এক স্থানীয় বাসিন্দার একটি ছোট পানের দোকান রয়েছে। অভিযোগ, মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে ব্লক যুব তৃণমূল নেতা দুর্জয় দাস, যুব নেতা সাইরাজ আলম, জাবির শেখ, আলম ও রহমান সহ একদল যুবক মদ্যপ অবস্থায় ওই পানের দোকানে চড়াও হয়। তারা সুকুমার বাবুর কাছে মোটা অঙ্কের তোলা দাবি করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে।
আক্রান্ত পানের দোকানদার সুকুমার সাহা ক্ষোভ ও আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে বলেন, “দুর্জয় দাস, সাইরাজ, জাবির সহ আরও অনেকে আজকে আমার দোকানে এসে আচমকা তোলা দাবি করে। আমি গরিব মানুষ, অত টাকা দিতে অস্বীকার করতেই ওরা ক্ষিপ্ত হয়ে দোকানে ঢুকে আমাকে মারধর শুরু করে। পুরো দোকান ভাঙচুর করে আমার ক্যাশ বাক্সে রাখা ব্যবসার ৪৭ হাজার টাকা জোরপূর্বক লুঠ করে চম্পট দেয়। আমি হরিশ্চন্দ্রপুর থানায় মুখ খুলতেই ওরা আমাকে প্রাণে মারার হুমকি দিচ্ছে।” ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ ইতিমধ্যেই পুলিশের হাতে পৌঁছেছে।
এই ন্যাক্কারজনক ঘটনা সামনে আসতেই হরিশ্চন্দ্রপুরে তৃণমূলের ভেতরের আদি-নব্য গোষ্ঠীকোন্দল ও বিস্ফোরক অভিযোগ প্রকাশ্যে চলে এসেছে। ঘটনার তীব্র নিন্দা করে তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠনের (INTTUC) ব্লক সভাপতি সাহেব দাস সরাসরি নিজের দলেরই নেতাদের কাঠগড়ায় তুলে বলেন, “আজকে যারা এই ভাঙচুর ও লুঠপাটের ঘটনায় জড়িত, তারা সবাই হরিশ্চন্দ্রপুরের সদ্য প্রাক্তন মন্ত্রী তাজমুল হোসেনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। প্রাক্তন মন্ত্রীর ভাইয়ের মদত ও উস্কানিতেই এই যুব নেতারা দীর্ঘদিন ধরে গোটা এলাকায় সিন্ডিকেট ও তোলাবাজি চালাচ্ছিল। আমরা দলের অন্দরে বহুবার এর প্রতিবাদ করেছি।”
ঘটনার প্রতিবাদে হরিশ্চন্দ্রপুর ব্যবসায়ী সমিতির সদস্যরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে অবিলম্বে দোষী যুব নেতাদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন। প্রশাসন পদক্ষেপ না করলে গোটা হরিশ্চন্দ্রপুর জুড়ে সমস্ত ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা। অন্যদিকে, মালদা জেলা বিজেপির হেভিওয়েট নেতা রূপেশ আগরওয়াল এই নিয়ে শাসক দলকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “হরিশ্চন্দ্রপুরে তৃণমূলের দুষ্কৃতীরাজ চরমে পৌঁছেছে। থানা থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে গরিব ব্যবসায়ীরা নিরাপদ নন। আমরা চাই পুলিশ কোনও রাজনৈতিক চাপ না মেনে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে দোষীদের কঠোরতম শাস্তি দিক।”
এই মেগা স্ক্যাম ও মারধরের অভিযোগ নিয়ে অবশ্য সাফাই দিয়েছেন অভিযুক্ত যুব তৃণমূল নেতা দুর্জয় দাস। তাঁর দাবি, “আমি ঘটনাস্থলে ছিলামই না, ব্যক্তিগত কাজে বাইরে আছি। রাজনৈতিক চক্রান্ত করে আমাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে।” অন্যদিকে, ফোনে যোগাযোগ করা হলে সদ্য প্রাক্তন মন্ত্রী তজমুল হোসেন কলকাতা থেকে জানান, “আমি ব্যক্তিগত কাজে বর্তমানে কলকাতায় রয়েছি। হরিশ্চন্দ্রপুরের এই ঘটনায় কে বা কারা জড়িত, সে সম্পর্কে আমার কিছুই জানা নেই। আমি বা আমার পরিবার কোনও দিনই কোনও রকম হিংসা বা তোলাবাজিকে মদদ দিই না।”
হরিশ্চন্দ্রপুর থানার আইসি সুমিত কুমার ঘোষ জানিয়েছেন, “ব্যবসায়ীর মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে প্রাথমিক ধড়পাকড় ও জিজ্ঞাসাবাদ আরম্ভ করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ জমা পড়তেই আইন মেনে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
