সৌরভকুমার মিশ্র, হরিশ্চন্দ্রপুর : এগিয়ে হরিশ্চন্দ্রপুর। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলার পরিযায়ীরা যখন আক্রান্ত, রুটিরুজির তাগিদে মাতৃভাষা প্রকাশ্যে বলতে চাইছেন না বাংলার শ্রমিকরা, তখন বিহারের পরিযায়ীরা নিশ্চিন্তে, নির্ভয়ে কাজ করছেন বাংলার হরিশ্চন্দ্রপুরে। বাংলায় যে কখনও, কোনও অবস্থাতেই ভাষা সমস্যায় পড়তে হয়নি বা হচ্ছে না, প্রকাশ্যে তাঁরা বলছেন নিজেদের মাতৃভাষাতেই। শুধু তাই নয়, নানা প্রদেশের দেশ যখন একটা, তখন ভাষা নিয়ে কেন বিরোধ, সেই প্রশ্ন তাঁরা তুলে দিয়েছেন বাংলার শ্রমিকদের পক্ষ নিয়ে।
হরিয়ানা থেকে রাজস্থান, পঞ্জাব থেকে কেরল, ভিনরাজ্যে কাজ করতে গিয়ে হেনস্তার শিকার বাংলার শ্রমিকরা। শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য বাংলাদেশি দাগিয়ে দিয়ে তাঁদের বাড়ি বা কর্মস্থল থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। রাখা হচ্ছে ডিটেনশন ক্যাম্পে। এর মধ্যে বাংলাদেশে পুশব্যাক করার ঘটনাও ঘটেছে। নতুন বিতর্ক জন্ম দিয়েছে দিল্লি পুলিশ, বাংলাকে বাংলাদেশি ভাষা হিসেবে তুলে ধরে। রাজনীতির লড়াই নতুন মাত্রা পেয়েছে এমন ঘটনায়। উদ্ভূত এমন পরিস্থিতির মধ্যে ভিনরাজ্য ছেড়ে বাংলায় ফিরে আসা শুরু হয়েছে পরিযায়ীদের। সম্প্রতি হরিশ্চন্দ্রপুর থানা এলাকার তালগাছি এবং রাঙ্গাইপুরের বেশ কয়েকজন শ্রমিককে হরিয়ানা এবং ওডিশাতে আটকে রেখে অত্যাচার চালানো হয়েছিল বলে অভিযোগ।
কিন্তু বিহার লাগোয়া এই হরিশ্চন্দ্রপুরেই উলটো ছবি। মাখনা তৈরির শিল্পাঞ্চল বলে পরিচিত হরিশ্চন্দ্রপুরে এখনও ভয়ডরহীনভাবে রোজগার করছেন বিহারের দ্বারভাঙ্গা এলাকার হিন্দিভাষী প্রায় ২০ থেকে ২২ হাজার শ্রমিক। নির্বিঘ্নে থাকছেন পরিবার নিয়ে মাসের পর মাস। তবে যেহেতু এঁদের ছাড়া মাখনা বীজ থেকে খই তৈরি অসম্ভব, তাই এলাকার অর্থনীতির স্বার্থে তাঁদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করছেন স্থানীয়রাই। পাশে থাকছেন সবসময়। দ্বারভাঙ্গার কেওটিয়া এলাকার বাসিন্দা ললিত সাহানি বলছেন, ‘দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে মাখনার মরশুমে হরিশ্চন্দ্রপুরে থাকছি পরিবার নিয়ে। আগে বছরে ছ’মাস থাকলেও বর্তমানে সময়টা বেড়ে ৮-১০ মাস হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনওদিন ভাষাগত সমস্যায় পড়তে হয়নি। কোনও বাঙালি আমাদের সমস্যায় ফেলেনি।’ বিহারের বাহাদুরপুর এলাকার বাসিন্দা মীরা সাহানি। তিনি বলেন, ‘বিয়ের পর থেকে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। প্রায় কুড়ি বছর হয়ে গেল স্বামীর হাত ধরে এই এলাকায় এসেছিলাম। এখন আমার ছেলেরাও এই কাজে যুক্ত। প্রতিবছর এখান থেকে মাখনা থেকে খই তৈরি করে যা রোজগার হয়, তা দিয়েই আমাদের বছরের সংসার খরচ চলে। শুনতে পাচ্ছি এখানকার কিছু লোক ভাষার কারণে বাইরে কাজ করতে গিয়ে আক্রমণের শিকার হয়েছে। এটাকে আমি সমর্থন করছি না। পেট চালানোর জন্য দেশের যে কোনও প্রান্তে যাওয়ার অধিকার সবার রয়েছে।’
গৌড় কলেজের অধ্যাপক ঋষি ঘোষের বক্তব্য, ‘উত্তর বিহারের একটা বিস্তীর্ণ অঞ্চল একসময় মিথিলা হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখান থেকে যুগ যুগ ধরে শ্রমিক মাইগ্রেশন হয়ে বাংলায় আসছে। এরসঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় অর্থনীতি। শুধু হিন্দিভাষী বলে যদি তাঁদের ওপর আক্রমণ হয়, তাহলে মাখনা নিয়ে যে অর্থনৈতিক উন্নতির পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা ধ্বংস হয়ে যাবে। তাছাড়া এঁদের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান সমস্তটাই বাংলার মাটিতে পালিত হচ্ছে।’ পেশায় শিক্ষক সুব্রত দাস মনে করেন, ‘বিহারের শ্রমিকরা যতদিন থাকবেন, ততদিন এলাকার অর্থনীতি সঠিক পথে পরিচালিত হবে। তাই দেশের বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব এখানে পড়বে না।’
