উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: যুবভারতীর হাজার হাজার দর্শক যে প্রেম ও সম্মান দেখাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, ওয়াংখেড়ে যেন তা সুদ-সমেত ফিরিয়ে দিল লিওনেল মেসিকে। রবিবার মুম্বইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম সাক্ষী রইল এক নিখুঁত, হৃদ্যতাপূর্ণ ফুটবল-উৎসবের। এটি নিছক একটি প্রদর্শনী ছিল না, ছিল কিংবদন্তিকে প্রাপ্য সম্মানে ভূষিত করার এক সার্থক আয়োজন।
যুবভারতীতে যেখানে মেসিকে মাত্র ২২ মিনিটেই অস্বস্তি নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল, সেখানে ওয়াংখেড়েতে তিনি কাটালেন পূর্ণ ৬১ মিনিট! তাঁর সঙ্গী লুইস সুয়ারেজ এবং রদ্রিগো ডি’পলও ছিলেন হাসিমুখে। নিরাপত্তা প্রাচীর নয়, বরং ভক্ত ও তারকার মধ্যে বজায় ছিল এক স্নিগ্ধ দূরত্ব, যা ছবি তোলার ভিড় বা ধাক্কাধাক্কির সুযোগ দেয়নি। যুবভারতীতে মেসিদের দেখে বোঝা যাচ্ছিল, বিরক্ত হচ্ছেন। সুয়ারেজ ও ডি’পল তো ভিড়ে ধাক্কাও খান। কিন্তু ওয়াংখেড়ে দেখাল, কী ভাবে একটি সফল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যায়।
মুম্বই শুধু মেসিকে দেখল না, দেখল ভারতের দুই ‘গোট’-এর ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ। শচীন তেন্ডুলকর, যিনি এই মাঠেই অসংখ্য স্বপ্ন পূরণ হতে দেখেছেন, তাঁর সঙ্গে দেখা হল ফুটবলের মহাতারকা মেসির। পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন ভারতের বর্তমান ফুটবল-আইকন সুনীল ছেত্রীও। সুনীলকে নিজের সই করা আর্জেন্টিনার জার্সি উপহার দিলেন মেসি— এক ফ্রেমে ধরা পড়ল দুই কিংবদন্তির আদান-প্রদান।
অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার বহু আগেই দুপুর ২টো থেকে দর্শকে ভরে গিয়েছিল ওয়াংখেড়ে। মাঠে নামলেন সুনীল ছেত্রী, আশুতোষ মেহতা, বালা দেবীর মতো ফুটবলাররা। ছিলেন অভিনেতা অজয় দেবগণ হরভজন সিং (সস্ত্রীক) এবং করিনা কপূর খান। ব্রেবোর্ন স্টেডিয়ামের ‘প্যাডল কাপ’-এ দেখা দিয়েছিলেন ডি’পল ও সুয়ারেজও।
তবে ওয়াংখেড়ের আয়োজনের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী দিকটি ছিল তারকাদের বিনয়। যুবভারতীর মতো এখানে ক্রীড়ামন্ত্রী বা কোনও খ্যাতনামী নেতা সারাক্ষণ মেসির পাশে ছিলেন না। মাঠে থাকা কোনও খেলোয়াড় বা অতিথি মেসির সঙ্গে নিজস্বী তোলার চেষ্টা করেননি। এই শ্রদ্ধাপূর্ণ পরিবেশই নিশ্চিত করেছিল তারকারদের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য।
মুম্বইয়ের এই অনুষ্ঠানটিতে হল মহারাষ্ট্র সরকারের ‘প্রজেক্ট মহাদেব’-এর শুভ উদ্বোধন। রাজ্যের ৩৫টি জেলা থেকে ছেলে-মেয়েদের বাছাই করে পাঁচ বছরের স্কলারশিপে ফুটবল শেখানোর এই মহৎ উদ্যোগের সূচনা হল স্বয়ং মেসির হাতে। বাচ্চাদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টায় ‘পাসিং দ্য বল’ খেললেন মেসি, সুয়ারেজ ও ডি’পল। ডি’পলকে দেখে মনে হচ্ছিল, যেন তিনি নিজের সতীর্থদের সঙ্গে খেলছেন— এতটাই সহজ ও প্রাণবন্ত ছিল সেই মুহূর্ত।
অনুষ্ঠানের শেষলগ্নে মঞ্চে সংবর্ধনা জানানো হয় তিন তারকাকে। শচীন তেন্ডুলকর তাঁর সই করা জার্সি তুলে দিলেন মেসির হাতে, আর মেসি পালটা শচীনকে দিলেন ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের বল।
শচীন তাঁর বক্তৃতায় বলেন, “দুর্দান্ত সময় কাটালাম। মুম্বই স্বপ্নের নগরী। এই মাঠে অনেক স্বপ্ন সত্যি হতে দেখেছি। আরও এক বার তা দেখলাম। মুম্বই তিন তারকাকে যে ভালবাসা দিয়েছে তার জন্য সকলকে ধন্যবাদ। মেসির খেলা নিয়ে বলার কিছু নেই। একটা কথাই বলব। খেলার পাশাপাশি ও দারুণ একজন মানুষ।”
ওয়াংখেড়ে প্রমাণ করল, তারকাদের সম্মান জানানোর অর্থ ভিড় বা ব্যক্তিগত স্বার্থের সেলফি নয়। সম্মান মানে সুষ্ঠু আয়োজন, নিরাপদ দূরত্ব এবং ভালোবাসার নির্ভার আদান-প্রদান। তাই এদিন জয়ধ্বনি শুধু মেসির জন্য নয়, সমানে শোনা গেল সুয়ারেজ এবং ডি’পলের নামেও। আর তাতেই স্পষ্ট হয়ে গেল, ওয়াংখেড়ে তার হৃদয়ের দরজা খুলে দিয়েছিল বিশ্ব ফুটবলের তিন মহাতারকার জন্যই। এই ৬১ মিনিট কার্যত ভারতের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এক নতুন এবং সফল আয়োজনের মাপকাঠি হয়ে থাকবে।
