সব্যসাচী চট্টোপাধ্যয়, শিলিগুড়ি: হাড়কঙ্কাল বের করা বাড়িঘর, ধ্বংসের বীভৎস ক্ষতের মধ্যে দিনরাত বসবাস। বাস্তবেই নৈরাজ্যের পুরী। আশার আলো বলে কিছু নেই চারপাশে। প্যালেস্তাইনের যে পরিবেশে শৈশবের বেড়ে ওঠা এক বিভীষিকা। অবসাদে আচ্ছন্ন মন। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় বিকেলের এক মরা রোদে সিনেমা দেখছে একদল শিশু। ডিজনির বিখ্যাত অ্যানিমেশন সিনেমায় ঘুরে দাঁড়ানোর কাহিনী।
আলো-আঁধারিতে প্রোজেক্টরে সিনেমা দেখানো হচ্ছে। স্ক্রিনের আলো যেটুকু ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে পিছনে, চারপাশে মৃত্যুপুরীর আভাস। বোমার আঘাতে এলাকার বাড়িগুলো গুঁড়িয়ে গিয়েছে। কিংবা হাড়গোড় সম্বল করে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে শিশুরা যেন আশপাশের জগৎ কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভুলে গিয়েছে। মুগ্ধ হয়ে তারা দেখছে, জানছে, বুঝছে- এভাবেও ঘুরে দাঁড়ানো যায়।
অবসাদ কাটিয়ে ওঠার সেই মুহূর্তটি যেন উজ্জ্বল হয়ে ধরা পড়েছে প্যালেস্তিনীয় চিত্রসাংবাদিক ওমর নমন আশতাউই-র ক্যামেরায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ায় ছবিটি এখন সারা দুনিয়ার চর্চায়। যুদ্ধবিদ্ধস্ত গাজার (Gaza) বীভৎসতা এবং সমস্ত প্রতিকূলতাকে হারিয়ে ফের বেঁচে ওঠার চেষ্টা ওমর তাঁর লেন্সে বন্দি করে চলেছেন কিছুদিন ধরে। ওমরের ইনস্টাগ্রাম ফিডও ধ্বংসের ভিতর আশার বীজ বোনে।
সেখানে লাশের ছবির পাশে একটা শিশু তার পোষ্য কুকরকে স্নান করায়। বোমার আঘাতে চূর্ণ হওয়া শহরের পাশে বিস্ফোরণে পা হারানো মহিলাদের ফুটবল অনুশীলনের ছবিতে যেন জীবনের জয়গান। আছে বোমার আঘাতে আহত শিশুদের সাঁতার কাটার ছবিও। ওমরের ছবি এবং গাজার জেদ আসলে নীরবে এক সংগ্রামের কথা বলে। ফিরে আসার কথা বলে।
এই প্রতিবেদকের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে আলাপচারিতায় ওমর বলেন, ‘‘আমি চলতি বছরের অগাস্ট মাসের ৩০ তারিখ গাজা শহরের শেখ রেদোয়ান এলাকায় এই ফোটোটি তুলেছি। ‘দ্য মাশারাউই ফান্ড ফর ফিল্ম অ্যান্ড ফিল্মমেকার্স’ সংগঠন ‘লিটল উইংস’ বলে একটি কর্মসূচি চালু করেছে। যারা বাচ্চাদের জন্য বিভিন্ন বিনোদনমূলক কর্মসূচির আয়োজন করে। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে সেদিন ‘দ্য লায়ন কিং’-এর স্ক্রিনিংয়ের আয়োজন ছিল। যাতে শিশুরা খানিকক্ষণ হারানো শৈশবে ফিরে যেতে পারে।’’
‘দ্য লায়ন কিং’ সিনেমায় অনেকদিন পর সিম্বা (একটি সিংহ) তার পুরোনো আস্তানা ‘প্রাইড ল্যান্ড’- এ ফিরে আসে। বন্ধুরা সিম্বাকে জড়িয়ে ধরে। শেষপর্যন্ত সিম্বা রাজা হয়। ওই সিনেমা দেখে গাজার শিশুদের সুস্থ জীবনে ফেরার আশাটাই যেন ওমরের ছবিতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ওমরের কথায় বিষণ্ণতার ছোঁয়া। তাঁর তোলা ছবিতে জাদু-বাস্তবতা। যদিও বেশিরভাগটাই ট্র্যাজিক।
সিনেমার সিম্বা বাড়ি ফিরে চারদিকে ধ্বংসের চিহ্ন দেখতে পায়। গাজার শেখ রেদোয়ান এলাকার ধ্বংসস্তূপে বসে ডিজনির সিনেমা দেখার সময় যেন পর্দার বাঁধন ভেঙে সিম্বা আর গাজার শিশুদের একবিন্দুতে দাঁড় করায়। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), রয়টার্স, ইউনাইটেড নেশনস ডেেভল্পমেন্ট প্রোগামের (ইউএনডিপি) মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ওমরের।
খ্যাতনামা এই চিত্রসাংবাদিকের ভাষায়, ‘গাজায় জীবনধারণ এখনও খুব কঠিন। একটা নড়বড়ে শান্তি চুক্তি আছে বটে। কিন্তু …।’ এই ‘কিন্তু’-র পর ওমরের নীরবতা অনেক প্রশ্ন তোলে। একটু থেমে তিনি বলেন, ‘এত কিছুর পরেও এখানকার মানুষ আশা ছাড়েনি। বাঁচা ছাড়েনি। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশে যখন শিশুরা সিনেমার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে হাসে, আমি বাঁচার রসদ পাই। ওদের আশা আমার মধ্যেও যেন সংক্রামিত হয়।’
সিম্বা বাড়ি ফিরে ধ্বংস দেখে। কিন্তু লায়ন কিং শেষে আশার কথাই বলে। লেখার শুরু হয়েছিল জাদু-বাস্তবতা দিয়ে। শেষেও তাই ফিরে আসে। ফিরে আসে আশা, তবে অন্য একটি সিনেমার ডায়ালগের মধ্যে দিয়ে। ‘দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন’ ছবিতে ডায়ালগ আছে- ‘হোপ ইজ অ্যা গুড থিং, মে বি দ্য বেস্ট অফ থিংস। অ্যান্ড নো গুড থিংস এভার ডাইজ।’ ওমরের ছবি এবং ছবির শিশুরা সেই কথাই শেখায়।
শব্দ নিয়ে রাজনীতি নয়, শিক্ষাব্যবস্থার আসল সংকট কোথায়?

