গঙ্গারামপুর ও বালুরঘাট: কলকাতায় কালীঘাট ও ঋতব্রত গোষ্ঠীর তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে যখন রাজ্য রাজনীতি তোলপাড়, তারই আঁচ এবার এসে পড়ল দক্ষিণ দিনাজপুরের (Dakshin Dinajpur) গঙ্গারামপুরে (Gangarampur)। খাস উত্তরবঙ্গে ঋতব্রত লবির অত্যন্ত প্রভাবশালী বিধায়ক তথা প্রাক্তন মন্ত্রী বিপ্লব মিত্রের খাসতালুকে কার্যত নাস্তানাবুদ হতে হল কালীঘাট লবির নেতাদের। ২১ জুলাইয়ের প্রস্তুতি সভা করতে এসে জেলা পার্টি অফিসেই ঢুকতে পারলেন না তাঁরা। কার্যালয়ে ঝুলছিল তালা। বাধ্য হয়ে পাশের একটি ক্লাবে গিয়ে সভা সারতে হল তাঁদের। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গঙ্গারামপুর শহর তথা জেলাজুড়ে তৃণমূলের নজিরবিহীন গোষ্ঠীকোন্দল প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী, সোমবার গঙ্গারামপুর নিউ মার্কেট সংলগ্ন তৃণমূলের (TMC) জেলা কার্যালয়ে একুশে জুলাইয়ের প্রস্তুতি বৈঠকের ডাক দিয়েছিল কালীঘাট ঘনিষ্ঠ তৃণমূল নেতৃত্ব। সেই মতো বৈঠকে যোগ দিতে আসেন কুমারগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক তোরাফ হোসেন মণ্ডল, প্রাক্তন জেলা সভাপতি মৃণাল সরকার, বর্ষীয়ান নেতা গৌতম দাস, মফিজউদ্দিন মিয়ঁা সহ একঝাঁক প্রথম সারির নেতা-কর্মী। কিন্তু দলীয় কার্যালয়ের সামনে পৌঁছেই চক্ষু চড়কগাছ হয় তাঁদের। দেখা যায় দরজায় তালা ঝুলছে। কার্যালয় চত্বরে নেই কোনও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও চাবি না মেলায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন কর্মীরা। অগত্যা প্রেস্টিজ বাঁচাতে সংলগ্ন একটি ক্লাবে তড়িঘড়ি বৈঠকের ব্যবস্থা করতে হয় তাঁদের। তবে অপমান ও ক্ষোভের আগুন এখানেই দমে যায়নি। বৈঠক শেষ করে দলবল নিয়ে ফের জেলা কার্যালয়ে চড়াও হন কালীঘাট ঘনিষ্ঠ ক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা। বিপ্লব শিবিরের লাগানো তালার ওপর তাঁরা পালটা নিজেদের একটি নতুন তালা ঝুলিয়ে দেন। কার্যালয় দখল ও পালটা তালা লাগানোর এই নজিরবিহীন ঘটনায় গোটা গঙ্গারামপুর শহরে রাজনৈতিক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
ঘটনার পর বিপ্লবের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়ে মৃণাল বলেন, ‘আমরা বৈঠক করতে এসে দেখি জেলা কার্যালয় বন্ধ রয়েছে। বিপ্লব মিত্র-ঘনিষ্ঠ একজন কেয়ারটেকারের কাছে অফিসের চাবি ছিল। তাঁর দেখা পাওয়া যায়নি। পরিকল্পিতভাবে আমাদের বৈঠক ভেস্তে দেওয়ার জন্য এসব করা হয়েছে কি না বুঝতে পারছি না। কিন্তু তারপরেও আমাদের বৈঠক হয়েছে। সারা জেলার তৃণমূল নেতারা একযোগে উপস্থিত হয়ে বৈঠক করা হয়েছে।’ এর পরেই দলত্যাগী ও শিবির বদলকারী নেতাদের হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা তৃণমূলের জেলা। এই জেলার প্রতিটি তৃণমূল কর্মী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখে দল করেন। বিপ্লব মিত্রের ক্ষমতা থাকলে আগামীদিনের ঋতব্রতর ছবি ও সিম্বল নিয়ে নির্বাচনে লড়ে বা বৈঠক করে দেখাক। আমরাও আগামীদিনে বৈঠক করে দেখাব।’
বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির পর দক্ষিণ দিনাজপুরের বর্ষীয়ান তৃণমূল নেতা তথা প্রাক্তন মন্ত্রী বিপ্লব দলনেত্রীর হাত ছেড়ে ঋতব্রত শিবিরে নাম লেখান। দলবিরোধী কাজের জন্য তাঁকে দল থেকে বহিষ্কারও করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপর থেকেই বিপ্লবের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই জেলা কার্যালয়টি নিয়ে দুই শিবিরের টানাপোড়েন চলছিল। এদিন চাবি না পাওয়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে দিল জেলায় সাংগঠনিকভাবে এখনও কতটা কোণঠাসা কালীঘাট লবি।
এদিকে, ২১ জুলাইয়ের প্রস্তুতি সভার ডাক দিয়ে সমাজমাধ্যমে মৃণাল সরকারের একটি বিস্ফোরক পোস্ট ঘিরে জেলাজুড়ে জলঘোলা শুরু হয়েছে। পোস্টের মূল বার্তাই ছিল, ‘আমরা বেইমান নই’। নিজের পোস্টে কোনও ব্লক বা অঞ্চল কমিটির কথা উল্লেখ না করে মৃণাল কেবল তাঁদেরই আহ্বান জানিয়েছেন, যাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নেত্রী মানেন এবং ২১ জুলাইকে দলের আবেগ মনে করেন। এই ‘বেইমান’ তত্ত্ব নিয়ে তোলপাড় শুরু হতেই সুর আরও চড়িয়ে মৃণাল বলেন, ‘যাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি সামনে রেখে ভোটে জিতে বিভিন্ন পদে আসীন হয়েছেন, তাঁরাই আজ দুঃসময়ে দলনেত্রীর হাত ছেড়ে দিচ্ছেন। তাঁদেরই আমরা বেইমান বলেছি।’ নাম না করলেও এই তির যে সরাসরি বিপ্লবের দিকে তা জলের মতো পরিষ্কার। তবে এই গোটা ঘটনা এবং কালীঘাট শিবিরের তোপ নিয়ে বিপ্লবের কোনও প্রতিক্রিয়া যায়নি। তাঁকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। হোয়াটসঅ্যাপ করা হলেও কোনও উত্তর মেলেনি।

