Brazil vs Haiti World Cup 2026 | জয়ের সরণিতে ফিরলেও স্বস্তিতে নেই ব্রাজিল

Brazil vs Haiti World Cup 2026 | জয়ের সরণিতে ফিরলেও স্বস্তিতে নেই ব্রাজিল

ব্লগ/BLOG
Spread the love


সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, ফিলাডেলফিয়া: লিঙ্কন ফিন্যান্সিয়াল ফিল্ড স্টেডিয়ামের উপরিভাগটা যেন ইগলের ছড়ানো ডানার মতো। ফিলাডেলফিয়ার বিখ্যাত ফুটবল দল ‘ফিলাডেলফিয়া ইগলস’-এর ঘরের মাঠে আজ যেন এক অকাল লাতিন কোলাজ। গ্যালারিতে ৬৮,৩২৪ জন দর্শকের সিংহভাগই হলুদ জার্সিধারী। চারদিকে মিনি হুটোভিস্তার সেই তীব্র পরিচিত শোরগোল। প্রথম ম্যাচে মরক্কোর সঙ্গে ড্রয়ের পর কার্লো আন্সেলোত্তির রণকৌশল নিয়ে যখন ব্রাজিলের ও গ্লোবোর সাংবাদিক থেকে শুরু করে রোমারিও-রোনাল্ডোদের মতো প্রাক্তনরা তোপ দাগছিলেন, ঠিক তখনই আমেরিকার এই ঐতিহ্যবাহী শহরে সাম্বার চেনা ছন্দ পুরোপুরি না মিললেও, এল বহু কাঙ্ক্ষিত জয়। হাইতিকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযানে ২৪১ নম্বর গোলটি করে ফেলল ব্রাজিল, যা বিশ্বমঞ্চে জার্মানির সর্বোচ্চ ২৩৯ গোলের রেকর্ডকে টপকে সেলেকাওদের বসিয়ে দিল ইতিহাসের একক চূড়ায় (Brazil vs Haiti World Cup 2026)

এই জয়ের রূপকার ম্যাথিউস কুনহা। ছয়টি ভাষায় সাবলীল ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের এই ফরোয়ার্ড আজ যেন মাঠে পায়ের জাদুতে এক আশ্চর্য কবিতা লিখলেন। প্রথম ম্যাচে ইগর থিয়াগোকে খেলানোর ভুল স্ট্র্যাটেজি থেকে সরে এসে আন্সেলোত্তি আজ কুনহাকে নামিয়েছিলেন। ব্রাজিলে দশের মতোই বিখ্যাত নয় নম্বর জার্সি; আর সেই জার্সির মর্যাদা অটুট রাখলেন প্রয়োজনে অ্যাটাকিং মিডফিল্ড থেকে উইং কিংবা স্ট্রাইকার— যে কোনও পজিশনে খেলতে অভ্যস্ত এই তরুণ। তাঁর দৌলতেই খুলে গেল ভিনিসিয়াস জুনিয়ারের ড্রিবলিংয়ের স্পেস। ২৩ মিনিটে কুনহার প্রথম গোলটি হয়তো নিখাদ সাম্বা ফুটবল ছিল না, ছিল এক বুনো জেদ। মাঝমাঠে নিজেই বল কেড়ে নিয়ে পাস বাড়ান ভিনির দিকে। ভিনির শট হাইতিয়ান কিপার জনি প্লাসাইড ঠিকমতো গ্রিপ করতে না পারলে ফিরতি বলে শরীর ছুড়ে কুনহা বল জালে জড়ান।

তবে ৩৬ মিনিটের দ্বিতীয় গোলটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক নান্দনিক ক্যানভাস। ক্যাসেমিরোর ক্লিয়ারেন্স থেকে শুরু হওয়া কাউন্টার অ্যাটাকে ভিনিসিয়াস যখন বল নিয়ে এগোচ্ছেন, কুনহা তখন চিতাবাঘের গতিতে দৌড় শুরু করেছেন। ভিনির বাড়ানো সুচ-সুতো বুনটের পাস যখন কুনহার পায়ে পৌঁছায়, তখন ভারসাম্য কিছুটা হারিয়েছেন। কিন্তু চোখের পলকে, বাঁ পায়ের এক জাদুকরি ভলিতে বল জড়িয়ে দিলেন প্লাসাইডকে বোকা বানিয়ে। গোল করেই ভেজা ঘাসের ওপর শুয়ে দুই হাত নেড়ে তাঁর সেই চেনা উড়ন্ত উদযাপন! গ্যালারিতে তখন বসা বিশ্বজয়ী কিংবদন্তি রোনাল্ডিনহোও হাততালি দিচ্ছেন। প্রথমার্ধের ঠিক অতিরিক্ত সময়ে (৪৫+৩ মিনিট) লুকাস পাকুয়েতার দুর্দান্ত এক টার্নিং পাস থেকে ব্যবধান ৩-০ করেন ভিনিসিয়াস। যিনি আজ ব্রাজিলের জার্সিতে নিজের অন্যতম সেরা রাত কাটালেন (বিশ্বকাপের ৬ ম্যাচে ৩ গোল, ৩ অ্যাসিস্ট)। ডাগআউটে কালো স্যুট পরিহিত আন্সেলোত্তির চেনা ভ্রূ-জোড়া কুঁচকে থাকলেও, চোখে ছিল পরম স্বস্তি।

তবে দ্বিতীয়ার্ধের গল্পটা মোটেও সুখকর নয়। বিরতির পর ব্রাজিল যেন আচমকাই ম্লান। একটিও শট অন-টার্গেট রাখতে পারেনি তারা। উলটে রকি বালবোয়ার ৫০ বছর পূর্তির রাতে পুঁচকে হাইতি যেন রকির মতোই শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়ল। গোল করতে না পারলেও তারা ব্রাজিলের ডিফেন্সের কঙ্কালটা বারবার বের করে দিয়েছে। গ্যাব্রিয়েল এবং মার্কুইনোসের রক্ষণকে নাচিয়ে অন্তত সাত-সাতটি শট নেয় ৮৪ র‍্যাংকিংয়ের হাইতি। কপাল ভালো যে ক্যাসেমিরো ও ব্রুনো গুইমারেসের ভুল সামাল দিতে গোলপোস্টের নীচে অতন্দ্র প্রহরী ছিলেন অ্যালিসন বেকার। তিন-তিনটি নিশ্চিত পতন রোধ করেন তিনি। অন্য প্রান্তে গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লির শট ক্রসবারে লাগে এবং এনড্রিকের গোল অফসাইডের জন্য বাতিল হয়। এই পরাজয়ে ১৯৭৪ সালের পর দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপে আসা হাইতি টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়া প্রথম দল হয়ে গেল। অন্যদিকে, একই দিনে মরক্কো ১-০ গোলে স্কটল্যান্ডকে হারানোয়, ৪ পয়েন্ট নিয়ে গোল পার্থক্যে গ্রুপ শীর্ষে এখন ব্রাজিল।

কিন্তু এই জয়ের রাতেও ব্রাজিলের আকাশে কালো মেঘ। ৩৯ মিনিটে হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে মাঠ ছাড়তে হয় রাফিনহাকে, যিনি কোয়ালিফায়ারে দলের সর্বোচ্চ গোলস্কোরার ছিলেন। অন্তত ১০ দিনের জন্য তিনি ছিটকে গেলেন, যা ব্রাজিলের উইং প্লে-র জন্য বড় ধাক্কা। রাফিনহার বদলে নামা বোর্নমাউথের তরুণ উইঙ্গার রায়ান তেমন দাগ কাটতে পারেননি। তবে ম্যাচের পর প্রেস বক্সে হাজির হয়ে আন্সেলোত্তি যে সুসংবাদ দিলেন, তাতেই যেন ফিলাডেলফিয়ার মেঘলা আকাশ এক লহমায় কেটে গেল। আন্সেলোত্তি স্পষ্ট জানালেন, ‘নেইমার সম্পূর্ণ সুস্থ। রবিবার ও ব্যক্তিগতভাবে এবং সোমবার দলের সঙ্গে পুরোদমে অনুশীলন করবে। আগামী ২৪ জুন মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে মরণবাঁচন ম্যাচে ও খেলতে নামছে।’

নেইমারের এই প্রত্যাবর্তনই হয়তো সাম্বার হারিয়ে যাওয়া ছন্দ ফিরিয়ে আনবে। কারণ, কোয়ার্টার ফাইনালের ছক বলছে, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে শেষ আটে ব্রাজিলের সামনে পড়তে পারে হ্যারি কেনের ইংল্যান্ড। সেই কঠিন যুদ্ধের আগে কুনহার এই গোল-যন্ত্রের আত্মপ্রকাশ আর নেইমারের ফিরে আসার গান— ফিলাডেলফিয়া থেকে মায়ামির বিমানে ওঠার আগে সেলেকাও সমর্থকদের বুকে অন্তত এক বুক স্বস্তির হাওয়া জোগাচ্ছে। হেক্সার রাস্তা হয়তো কঠিন, কিন্তু ব্রাজিলের সাম্বা নদী আবার নিজের গতিপথ খুঁজে পেয়েছে, এটাই আপাতত বড় খবর।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *