রাজু হালদার, গঙ্গারামপুর ও তপন: বুধবার দুপুর। স্যাঁতসেঁতে ঘর। চারপাশে অপরিচ্ছন্নভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নানা সামগ্রী। দই তৈরির পাত্র ও উপকরণে লেগে রয়েছে মাকড়সার জাল, কোথাও বা দইয়ে পড়ে পোকামাকড়। কার্যত চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই তৈরি হচ্ছিল দই। খাদ্য নিরাপত্তা দপ্তরের আধিকারিকদের বিশেষ অভিযানে এমনই চিত্র সামনে এল গঙ্গারামপুর (Gangarampur) ও তপন (Tapan) থানার বিভিন্ন দই তৈরির কারখানায়।
এবিষয়ে খাদ্য নিরাপত্তা দপ্তরের আধিকারিক নবনীতা মজুমদার বলেন, ‘গঙ্গারামপুর (Gangarampur curd) এবং নয়াবাজারের দই প্রসিদ্ধ। কিন্তু এই দইয়ের কারখানাগুলির অবস্থা কী? কীভাবে দই উৎপাদন করা হচ্ছে? এসব জানতে আজ গঙ্গারামপুর ব্লকের ৫টি এবং তপন ব্লকের ১টি দই তৈরির কারখানায় অভিযান চালানো হয়েছিল। সিংহভাগ ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটের কোনও সরকারি লাইসেন্স নেই। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দই তৈরি হচ্ছে। ইতিমধ্যে নমুনা সংগ্রহ করেছি। দোকান মালিকদের সাবধান করেছি। আগামীতে অস্বাস্থ্যকরভাবে দই উৎপাদন করলে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ করা হবে।’
দুপুরে তপন থানার নয়াবাজার বজ্রাপুকুর এলাকার একটি দই তৈরির কারখানায় বিশেষ অভিযান চালান খাদ্য নিরাপত্তা দপ্তরের আধিকারিকরা। অভিযানে গিয়ে আধিকারিকরা দেখেন, যেসব জায়গায় দই তৈরি করা হচ্ছে, সেখানে স্বাস্থ্যবিধি ন্যূনতমও মানা হচ্ছে না। দই তৈরিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ দীর্ঘদিন ধরে অপরিষ্কার অবস্থায় পড়ে। অনেক পাত্রে জমে রয়েছে ময়লা এবং মাকড়সার জাল। এমনকি তৈরি হওয়া দইয়ের মধ্যেও পোকামাকড় পড়ে রয়েছে কোথাও কোথাও। শুধু তাই নয়, কারখানার ডিপ ফ্রিজারেও মজুত রাখা ছিল দই ও ক্ষীর তৈরির বিভিন্ন সামগ্রী। সেগুলির সংরক্ষণের অবস্থাও অত্যন্ত খারাপ ছিল বলে জানান খাদ্য নিরাপত্তা দপ্তরের আধিকারিকরা। এই দৃশ্য দেখে কার্যত চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায় তাঁদের। শুধুই কি তাই, দই তৈরির কারখানাটির কোনও সরকারি লাইসেন্সও নেই। এরপর দই তৈরির কারখানার থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে পরীক্ষার জন্য। পাশাপাশি ওই কারখানা মালিকদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে খাদ্যসামগ্রী তৈরির কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই চিত্র ধরা পড়েছে গঙ্গারামপুর ব্লকের পাঁচটি দই তৈরিতে কারখানাতেও।
বজ্রাপুকুর এলাকার দই কারখানার মালিক প্রভাত রায়ের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এদিন তাঁর দই তৈরির কারখানায় বেশ কয়েকজন আধিকারিক এসেছিলেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে দই তৈরি করতে বলেছেন। কাজ করতে গিয়ে মাঝেমাধ্যে ভুল হয়ে যায়। আর যাতে ভুল না হয়, সেই বিষয়টা খেয়াল রাখবেন বলে জানান প্রভাত।
এবিষয়ে জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক সুদীপ দাসের প্রতিক্রিয়া, ‘আজ দই কারখানা সহ আরও বেশ কিছু স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে। লাইসেন্স এবং গুণগতমান সংক্রান্ত বেশ কিছু তথ্য উঠে এসেছে। খাদ্য সুরক্ষা অব্যাহত রাখতে আগামীদিনে জেলাজুড়ে এই ধরনের অভিযান চলবে।’ গঙ্গারামপুরের দই রাজ্যজুড়ে সুপরিচিত। বিশেষত গঙ্গারামপুরের ক্ষীর দই। রসনাতৃপ্তিতে শেষপর্যায়ে গঙ্গারামপুর দইয়ের জুড়ি মেলা ভার। কিন্তু দই তৈরির এই বেহাল চিত্র প্রকাশ্যে আসতে শিউরে উঠছে আমজনতা। শর্মিলা বাগচী নামে এক দইপ্রেমীর কথায়, ‘গঙ্গারামপুরের ক্ষীর দইয়ের জুরি মেলা ভার। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে সমস্ত আত্মীয় ও প্রিয়জন রয়েছেন, তাঁদেরকে গর্ব সহকারে গঙ্গারামপুরে দই উপহার দিই। আজ দইয়ের কারখানার এমন হাল শুনে খুবই খারাপ লাগছে।’
