উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে ফ্রান্স বনাম সেনেগাল (France vs Senegal) বলতে ফুটবলপ্রেমীদের মনে পড়ে যায় ২৪ বছর আগের সেই ২০০২ সালের একটা দিন। সেবার প্রথম ম্যাচেই আফ্রিকান দেশটির কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল তখনকার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে। পাপা বৌবা দিওফের সেই গোল হয়তো জিনেদিন জিদান কোনো দিন ভুলবেন না। কাকতালীয়ভাবে, সেই ঐতিহাসিক জয়ী দলের সদস্য পাপে থিয়াও এখন সেনেগালের কোচ। বুধবার রাতের ম্যাচেও প্রথমার্ধ দেখে মনে হচ্ছিল, সেই ২৪ বছর আগের ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে। মেটলাইফ স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে হাজির ৮০ হাজারের বেশি দর্শকের মধ্যে প্রায় ৭৫ হাজার ফরাসি সমর্থক যখন আশঙ্কায় কাঁপছেন, তখন ডাগআউটে মগজাস্ত্রের লড়াই চালাচ্ছিলেন দিদিয়ের দেশঁ (Didier Des)। আর প্রথমার্ধের সেই অস্বস্তি কাটিয়ে বিরতির পর দেশঁর একটি মাস্টারস্ট্রোকেই সেনেগালকে ৩-১ গোলে উড়িয়ে দিল গতবারের রানার্সআপরা।
ইতিহাসের পাতায় ফ্রান্স ও সেনেগালের লড়াইয়ের ইতিহাস কয়েকশো বছরের পুরনো। প্রায় ৩০০ বছর সেনেগাল শাসন করেছে ফ্রান্স, তাই এই ম্যাচটি আফ্রিকার দলটির কাছে ছিল এক প্রকার স্বাধীনতার যুদ্ধের মতোই। সম্পূর্ণ শক্তির দল নিয়ে মাঠে নামা ফ্রান্সকে তাদের নিজস্ব অস্ত্রেই থামানোর পরিকল্পনা করেছিলেন সেনেগাল কোচ থিয়াও। সাধারণত ফ্রান্স প্রতি-আক্রমণের ফুটবল খেলে, কিন্তু প্রথমার্ধে সেনেগালও একই কৌশল নেয়। সেনেগালের ডিফেন্ডার কৌলিবালি জোঁকের মতো লেগেছিলেন কিলিয়ান এমবাপের (Kylian Mbappe) সঙ্গে। ফলে প্রথমার্ধে ফরাসি অধিনায়ককে চেনাই যাচ্ছিল না, তিনি যেন পুরোপুরি বোতলবন্দি হয়ে ছিলেন। প্রথম ৪৫ মিনিটে বল সাজানোর জন্য সেনেগালের খেলোয়াড়েরা নিজেদের মধ্যে আদিবাসী ভাষা ‘ওলফ’-এ কথা বলছিলেন, যা দেম্বেলে ছাড়া বাকি ফরাসি ফুটবলারদের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অজানা। এই সুযোগে আক্রমণ আর রক্ষণের দারুণ এক ভারসাম্য তৈরি করে সেনেগাল। প্রথমার্ধে দু-দুটি সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করেন নিকোলাস জ্যাকসন ও ইসমাইলা সার। জ্যাকসনের একটি বাঁ পায়ের শট তো পোস্টে লেগে ফরাসি গোলরক্ষক মাইক মাইগনানের পায়ে লেগে কোনোমতে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ফলে প্রথমার্ধ শেষ হয় গোলশূন্যভাবেই।
কিন্তু প্রথমার্ধে এমবাপের মুখোশ পরে যেন অন্য কেউ খেলছেন মনে হলেও, ব্যতিক্রম ছিলেন মাইকেল ওলিসে (Michael Olise)। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে গোলের বন্যা বইয়ে দেওয়া এই ব্যালন ডি’অর পদপ্রার্থী একাই লড়ছিলেন। দ্বিতীয়ার্ধে আসল চালটি চাললেন কোচ দিদিয়ের দেশঁ। তিনি প্রথমার্ধের ১০ নম্বর পজিশন থেকে এমবাপেকে সরিয়ে উইং বা প্রান্তে পাঠিয়ে দিলেন, আর ওলিসেকে নিয়ে এলেন সেন্টারে। এই এক চালেই কৌলিবালির নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে ফাঁকা জায়গা পেয়ে যান এমবাপে। ছন্দে ফেরে পুরো দল। ম্যাচের ৫৯ মিনিটে বক্সের মধ্যে সাদিয়ো মানে এমবাপেকে ট্যাকল করলে পেনাল্টির জোরালো আবেদন ওঠে। অস্ট্রেলিয়ান রেফারি আলিরেজা ফাঘানি ‘ভিএআর’ (VAR)-এর সাহায্য নিয়েও পেনাল্টি দেননি, উলটে এমবাপের ডাইভিংয়ের জন্য গোল কিক দেন। ইরান বংশোদ্ভূত এই ‘টাফ’ রেফারি পুরো ম্যাচেই শারীরিক ফুটবলকে বেশ ছাড় দিয়েছিলেন।
পেনাল্টি না পাওয়ার ক্ষোভ যেন ফরাসিদের আরও তাতিয়ে তোলে। চেলসির হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা সেনেগালের প্রাচীরসম গোলরক্ষক এডুয়ার্ড মেন্ডি দুবার এমবাপে ও ওলিসেকে রুখে দিলেও ৬৬ মিনিটে আর পারলেন না। ওলিসের বাড়ানো ডিফেন্সচেরা অনবদ্য পাস ধরে মেন্ডির পায়ের পাশ দিয়ে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন এমবাপে। গোল খেয়ে সেনেগাল যখন অল-আউট আক্রমণে ওঠে, তখন দেশঁ আরেকটি নিখুঁত চাল চালেন। দেম্বেলেকে তুলে গতিময় ব্র্যাডলি বার্কোলাকে মাঠে নামান। মাঠে নামার মাত্র ১৯০ সেকেন্ডের মাথায়, অর্থাৎ ৮২ মিনিটে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ফাঁকা পাওয়ার সুযোগে গতিতে পরাস্ত করে ২-০ করেন বার্কোলা (Bradley Barcola)।
খেলার নাটকীয়তা তখনও বাকি ছিল। অতিরিক্ত সময়ে এমবাপের জন্মস্থান বন্ডিতেই জন্ম নেওয়া সেনেগালের তরুণ তুর্কি ইব্রাহিম এমবায়ে একক দক্ষতায় একটি অসাধারণ গোল করে ব্যবধান ৩-১ করেন। সেনেগাল যখন সমতায় ফেরার স্বপ্ন দেখছিল, তার ঠিক এক মিনিট পরেই হাজির হল আসল ‘এমবাপে ম্যাজিক’। প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে তাঁর নেওয়া এক বিদ্যুৎগতির দূরপাল্লার শট মেন্ডির হাত ছুঁয়ে তেকাঠিতে জড়িয়ে যায়। চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা এই গোলের মাধ্যমে সেনেগালের সব আশা শেষ হয়ে যায়। এই জোড়া গোলের হাত ধরে বিশ্বকাপে নিজের ১৪তম গোলটি করে ফেললেন এমবাপে, যার মধ্যে ১৩টিই এসেছে দ্বিতীয়ার্ধে। একই ম্যাচে তিনি টপকে গেলেন পেলে, লিওনেল মেসি এবং ফরাসি কিংবদন্তি জঁ ফঁথেকে। ছুঁয়ে ফেললেন জার্মানির গার্ড মুলারকে। এখন তাঁর সামনে শুধু ব্রাজিলের রোনাল্ডো ও জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোজে। ম্যাচ শেষে ৩ পয়েন্ট ও দুর্দান্ত পারফরম্যান্স নিয়ে যখন ফ্রান্স মাঠ ছাড়ছে, তখন ডাগআউটের ওস্তাদ দিদিয়ের দেশঁর দিকে তাকিয়ে হয়তো ২৪ বছর আগের ফরাসি অধিনায়ক জিনেদিন জিদান (Zinedine Zidane) সত্যিই হাত কামড়াচ্ছেন আর ভাবছেন—সেদিন যদি দেশঁ তাঁদের কোচ হতেন!

