FIFA World Cup 2026 | ভিনদেশের জার্সিতেই স্বপ্ন, মানচিত্রের কাঁটাতার মুছল ফুটবল

FIFA World Cup 2026 | ভিনদেশের জার্সিতেই স্বপ্ন, মানচিত্রের কাঁটাতার মুছল ফুটবল

শিক্ষা
Spread the love


জয় মণ্ডল, নিউ ইয়র্ক: নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের ৭৪ স্ট্রিটের একচিলতে রেস্তোরাঁ। বাইরে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি, আর ভেতরে ধোঁয়া ওঠা চায়ের সঙ্গে গরম শিক কাবাবের গন্ধ। এক কোণের টেবিলে বসে আড্ডা দিচ্ছেন লাহোরের তারিক আর জলন্ধরের গুরপ্রীত। সীমান্তের কাঁটাতার কিংবা ক্রিকেটের বাইশ গজে যে দুই দেশের মধ্যে কেবলই উত্তাপ আর চোখরাঙানি, আটলান্টিকের এপারে এসে তারা যেন এক অদ্ভুত সুতোর বাঁধনে বাঁধা। ইডেন কিংবা গদ্দাফির চেনা বৈরিতা এই হাডসন নদীর তীরে নিমেষেই গলে গিয়ে হয়ে যায় এক নির্ভেজাল পড়শি-আড্ডা। আমেরিকার এই শহরটার একটা অদ্ভুত গুণ আছে; সে সব চিরন্তন শত্রুতাকে এক লহমায় মায়াবী এক আড্ডার গল্পে বদলে দিতে পারে। অপূর্ব এক সহাবস্থান।

আড্ডার টেবিলটায় ইদানীং ক্রিকেটের চেনা ব্যাট-বল একপাশে সরে গিয়ে জায়গা করে নিয়েছে একটা চিরন্তনী গোলক। অথচ পরিসংখ্যানের খেরোখাতা খুললে এই দুই দেশের ফুটবল (FIFA World Cup 2026) নিয়ে শুধুই এক অন্তহীন হাহাকার। চব্বিশ কোটি মানুষের দেশ পাকিস্তান ফুটবল র‍্যাংকিংয়ের একেবারে তলানিতে, ১৯৮ স্থানে, ইতিহাসে জিতেছে মাত্র একটা কোয়ালিফায়িং ম্যাচ। আর ভারত? একশো চল্লিশ কোটির দেশটার কাছেও বিশ্বকাপ ফুটবল এক অলীক কুয়াশা। ক্রিকেট অন্ত প্রাণ এই উপমহাদেশে ফুটবল চিরকালই কিছুটা ব্রাত্য, কিছুটা অবহেলিত। কিন্তু জীবনের মতো ফুটবলও তো অদ্ভুত এক নিয়তি। আমরা যখন ভাবি আমাদের কিছু নেই, তখনই চোরাস্রোতের মতো চোরাবালি থেকে উঠে আসে বিস্ময়ের সব নাম। এবারের বিশ্বকাপ প্রমাণ করছে, মানচিত্রের কৃত্রিম কাঁটাতার দিয়ে রক্তের আসল টানকে কোনওভাবেই আটকে রাখা যায় না।নিজেদের দেশ যোগ্যতা না পেলেও, ভিনদেশের জার্সিতেই এখন বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়াচ্ছে এই উপমহাদেশের রক্ত।

যেমন গতকাল দেখছিলাম ইরাকের ২৩ বছরের তরুণ মিডফিল্ডার জিদান ইকবালকে। ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের অ্যাকাডেমি থেকে উঠে আসা এই প্রতিভার বাঁ পায়ের বুটে ইরাকের পতাকা থাকলেও, ডান পায়ের বুটে জ্বলজ্বল করছে পাকিস্তানের চাঁদ-তারা। জিদানের বাবা জন্মসূত্রে পাকিস্তানি। যে পাকিস্তানের মানুষ কোনওদিন বিশ্বকাপে নিজেদের কাউকেই দেখেনি, তাদের কাছে জিদান এখন এক নতুন ভোরের নাম। জিদান নিজেই বলছিলেন, ‘আমার বাবা আমার জীবনের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় মানুষ, তাঁর রক্ত বয়ে নিয়ে আমি গর্বিত।’ করাচি বা রাওয়ালপিন্ডির গলিগুলোতে এখন তাই ইরাকের জার্সির খোঁজ পড়ছে।

ঠিক এই রূপকথার অন্য পিঠটা আবার লিখছেন সারপ্রীত সিং। লস অ্যাঞ্জেলেসের মাঠে ইরানের বিরুদ্ধে নিউজিল্যান্ডের ২-২ ড্র হওয়া ম্যাচে অসাধারণ ফুটবল খেললেন এই উইঙ্গার। অকল্যান্ডে একটা ছোট্ট মুদির দোকান চালানো এক পাঞ্জাবি দম্পতির ছেলে সারপ্রীতের শেকড় কিন্তু জলন্ধরে। ফিলিপে কুটিনহোর বদলি হিসেবে বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে বুন্দেশলিগায় ডেবিউ করা প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত ফুটবলার তিনি। ২০১৮ সালে মুম্বইয়ের মাঠে ভারতের বিরুদ্ধেই খেলতে এসেছিলেন। আজ কঙ্গোর স্যামুয়েল মুতুসামি কিংবা অস্ট্রেলিয়ার নিশান ভেলুপিল্লাইদের পাশাপাশি সারপ্রীত বা জিদানরা যেন এক অলিখিত যুগলবন্দি তৈরি করেছেন।

এই তো জীবন! ক্রিকেটের বাইশ গজে যে ভারত-পাকিস্তান টেনশনে বুক কাঁপে লাখো মানুষের, ফুটবলের সবুজ ঘাসে এসে সেই দেশেরই উত্তরসূরিরা অন্য দেশের জার্সিতে বিশ্বজয় করতে নামছেন। জ্যাকসন হাইটসের আড্ডায় তারিক আর গুরপ্রীত আজ তাই এক অন্য আনন্দে বুক বাঁধছেন। নিজের দেশের পতাকা নেই তো কী, বুটের ডগায় তো জ্বলছে জলন্ধর আর করাচির চেনা নকশা। ভিনদেশের এই ফুটবল-সংগীতই আজ এক করে দিয়েছে দুই ভিন্ন মানচিত্রের মানুষকে। বিশ্বকাপ তো আসলে শুধু ট্রফি জয়ের আসর নয়, এ হল মানুষের বেঁচে থাকার, চিনে নেওয়ার এক রঙিন কোলাজ।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *