সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, নিউ জার্সি: বিশ্বকাপ (FIFA WORLD CUP 2026) মানেই তো এক বাঁধভাঙা আবেগের বিস্ফোরণ! যার টানে হাজার হাজার মানুষ চার-চারটে বছর চাতক পাখির মতো অপেক্ষায় থাকে। এই সবুজ গালিচাকে কেন্দ্র করে মাঠের ভেতর যেমন জয়-পরাজয়ের মহাকাব্য লেখা হয়, মাঠের বাইরে তেমনই তৈরি হয় কত সম্পর্কের সমীকরণ, কত প্রেম আর কত ফ্যাশনের (Vogue) নিত্যনতুন কোলাজ। এবার তো বিশ্বকাপ একেবারে হলিউডের খাসতালুকে। আমেরিকার প্রথম ম্যাচেই গ্যালারিতে ডেভিড ও ভিক্টোরিয়া বেকহ্যাম কিংবা টম ক্রুজদের উপস্থিতি চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু বিশ্বখ্যাত এই সেলেবদের চেনা গ্ল্যামারকেও এক লহমায় ম্লান করে দিল আফ্রিকার এক দেশ-কঙ্গো। ১৯৭৪ সালের পর ফের বিশ্বমঞ্চে পা রেখেই তারা বুঝিয়ে দিল, মাঠ মাতানোর আগেই গ্যালারির মন কীভাবে জিতে নিতে হয়। হিউস্টনের মাটিতে বিমান থেকে নামা মাত্রই গোটা ফুটবল বিশ্ব একবাক্যে কঙ্গোর (Congo) আউটফিটকে এবারের বিশ্বকাপের সেরার তকমা দিয়ে দিল।
ফুটবলাররা যখন একে একে উড়ান থেকে নেমে আসছিলেন, দেখে মনে হচ্ছিল যেন আফ্রিকার আদিম জঙ্গল থেকে রাজকীয় ভঙ্গিতে হেঁটে এল একদল চিতাবাঘ। কালো রঙের ব্লেজারের কলারের একটা দিক লেপার্ডের গায়ের চামড়ার মতো উজ্জ্বল সোনালি নকশায় মোড়া, হাতে একই ডিজাইনের সুদৃশ্য ব্যাগ। রাতারাতি খোঁজ পড়ে এই সুটের নেপথ্যের জাদুকরের। প্যারিসে থাকা কঙ্গোর মাত্র ৩০ বছরের অনামী ডিজাইনার আলভিন মাক এখন গ্লোবাল ফ্যাশনের নতুন তারকা। মাক বলছিলেন, ‘কঙ্গোর মানুষ তিনটি জিনিস সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে-মিউজিক, ফ্যাশন আর খেলা। আমাদের সংস্কৃতিতে একে বলে ‘লা সেপ’। পোশাকটা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে মনে হয় ছেলেরা কোনও রাজকীয় বিয়ে বা কোনও এলিট পার্টিতে এসেছে। কঙ্গোর সংস্কৃতিতে লেপার্ড মানে হল শক্তি। আমি সেই এনার্জিটাই গোটা দলকে দিতে চেয়েছিলাম।’ চিতার এই ছোঁয়া রয়েছে তাঁদের টাই এবং ব্লেজারে লাগানো ব্রোচেও। কারণ কঙ্গো ফুটবল দলের ডাকনামও যে ‘লে লেপার্ড!’
কঙ্গোর এই রাজকীয় উল্লাস যখন হিউস্টনের বুকে রঙের আলো ছড়াচ্ছে, ঠিক তখনই মেক্সিকোতে ঘাঁটি গাড়া ইরানের ফুটবলারদের সুটের দিকে তাকালে বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে। কঙ্গোর ব্লেজারে যেখানে শক্তির প্রতীক চিতাবাঘ, ইরানের ফুটবলারদের বুকের ব্রোচে সেখানে জ্বলজ্বল করছে ‘১৬৮’ সংখ্যাটি। কোনও জাঁকজমক বা উল্লাস নয়, এক নিদারুণ মনখারাপের বার্তা লুকিয়ে আছে এই রুপোলি বোতামে। যুদ্ধের আগুনে অকালে ঝরে যাওয়া ১৬৮ জন নিষ্পাপ শিশুর স্মৃতিকে বুকে নিয়েই এবার বিশ্বমঞ্চে হাঁটছেন ইরানি ফুটবলাররা। পৃথিবীকে মনে করিয়ে দিতে চান, ফুটবল যখন আনন্দের উৎসব ছড়াচ্ছে, তখনও পৃথিবীর কোনও এক কোণে বুলেটের আঘাতে চূর্ণ হয়ে যাচ্ছে শৈশব।
ফুটবলারদের হেয়ার স্টাইল থেকে ব্লেজারের কাট- বিশ্বকাপ বরাবরই নতুন ট্রেন্ডের জন্ম দেয়। কিন্তু এবার কঙ্গো আর ইরান দেখাল, পোশাক শুধু চামড়া ঢাকার আস্তরণ নয়, তা কখনও হয়ে উঠতে পারে নিজের সংস্কৃতিকে উদযাপনের দর্পণ, আবার কখনও বা বিশ্ববিবেকের কাছে এক নিঃশব্দ প্রতিবাদের ইস্তেহার। এই আনন্দ আর বিষাদের যুগলবন্দিতেই তো প্রাণ পায় বিশ্বকাপের এই মহাযজ্ঞ।

