সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায় নিউ জার্সিঃ আমেরিকার কংক্রিটের অরণ্যে, যেখানে আকাশচুম্বী (FIFA World Cup 2026) ইমারতগুলো যেন মানুষের স্বপ্নের চেয়েও উঁচু, সেখানে হলুদ জার্সির আড়ালে এবার নীরবে কাজ করছে এক অন্য জাদুকর। সাম্বার সেই চিরচেনা, বাঁধনছাড়া আবেগের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গিয়েছে নিখুঁত বিজ্ঞানের স্পন্দন। মরক্কোর বিরুদ্ধে শনিবারের মহারণের ফলাফল এতক্ষণে আপনাদের চোখের সামনে। কিন্তু মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ ক্যানভাসে ভিনিসিয়াস জুনিয়ারদের পায়ের ছন্দের যে ছবিই আঁকা হোক না কেন, তার নেপথ্যে ছিল এক অদ্ভুত প্রস্তুতি। গত চব্বিশ বছরের খরা কাটাতে, বুকে ছয় নম্বর তারাটি তুলে নেওয়ার অদম্য বাসনায় কার্লো আনসেলোত্তির ব্রাজিল এবার পুরোপুরি ভরসা রাখছে ‘স্মার্ট ভেস্ট’ বা সেন্সরযুক্ত বিশেষ অন্তর্বাসের ওপর।
ফুটবল মাঠে ব্রাজিলের খ্যাতি বরাবরই তাদের সহজাত শিল্প আর আবেগের জন্য। কিন্তু গত পাঁচটি বিশ্বকাপের ব্যর্থতার হিমশীতল শূন্যতা এবার সেলেকাওদের বাধ্য করেছে অঙ্কের খাতায় আরও তীক্ষ্ণ হতে। পর্দার আড়ালে স্পোর্টস সায়েন্টিস্টরা এখন খেলোয়াড়দের প্রতিটা পদক্ষেপের ওজন মাপছেন। দৌড়ের গতি, হৃৎস্পন্দন থেকে শুরু করে চোট সারিয়ে ওঠার খতিয়ান- সবকিছুই ধরা পড়ছে ওই স্মার্ট ভেস্টের অদৃশ্য জালে। দেখতে অনেকটা স্পোর্টস ব্রার মতো এই ভেস্টের পকেটে লুকোনো জিপিএস হাজার হাজার মাইল দূর থেকেও ফুটবলারদের শারীরিক অবস্থার মানচিত্র কোচের চোখের সামনে তুলে ধরে। কার পেশিতে কতটা টান পড়ছে বা চোটের ঝুঁকি কতটা, তা মেপেই ঠিক হচ্ছে কে প্রথম একাদশে থাকবেন আর কেই বা নামবেন পরিবর্ত হিসেবে।
তবে ফুটবলে পরিসংখ্যানই সব শেষ কথা নয়। ব্রাজিলের স্পোর্টস সায়েন্স বিভাগের প্রধান গুইলহের্মে পাসোস ডেটা ঘাঁটতে গিয়ে একবার অবাক হয়ে দেখেছিলেন, দলের এক ফুটবলার গোটা ম্যাচে মাত্র ৬ কিলোমিটার দৌড়াচ্ছেন, যেখানে বাকিরা তার প্রায় দ্বিগুণ ছুটছেন। শুধু জিপিএস-এর অঙ্কে ছেলেটি চূড়ান্ত ব্যর্থ। কিন্তু আনসেলোত্তির কোচিং স্টাফরা যখন ভিডিও অ্যানালিসিস করলেন, দেখা গেল পুরো অন্য ছবি। ওই ফুটবলারটি মাঠে এতটাই বুদ্ধিমান যে, সব সময় নিখুঁত ট্যাকটিকাল পজিশনে দাঁড়িয়ে খেলছেন। অকারণে দৌড়ানোর তাঁর প্রয়োজনই হচ্ছে না! অর্থাৎ, প্রযুক্তি শুধু পথ দেখায়, কিন্তু সেই দুর্গম পথে হাঁটার জন্য প্রয়োজন একজন নিপুণ নাবিকের।
ঠিক এখানেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন কোচ আনসেলোত্তি। টিটের আমলের সেই খোলামেলা, হাসিমুখের মেজাজ আজ উধাও। ইতালীয় কোচের চোখেমুখে এখন জমাট বাঁধা গাম্ভীর্য। যে দেশের অপর নাম ফুটবল, তাদের ২২ বছরের ব্যর্থতার পাহাড় যেন তাঁর কাঁধে। তাঁর দর্শনে, ‘মনে ভয় না থাকলে সিংহকে তুমি বিড়াল ভেবে বসতে পারো।’ এই ‘ভয়’ কোনও দুর্বলতা নয়, বরং ইউরোপীয় ঘরানায় তা হল লক্ষ্যে অবিচল থাকার এক চূড়ান্ত সতর্কতার বর্ম।
আর এই ইউরোপীয় কাঠিন্যের সঙ্গেই এক অদ্ভুত কাব্যিক রসায়ন তৈরি হয়েছে ভিনিসিয়াসের। রিয়াল মাদ্রিদে আনসেলোত্তির ছাত্র হিসেবে জোড়া চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার সুবাদে দুজনের বোঝাপড়া এখন নিখুঁত। বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে ভিনিসিয়াস যেন অসম্ভব শান্ত, এক ধ্যানের মুদ্রায়। তাঁর কথায়, ‘কোচ আমাকে মাঠে সেরাটা দেওয়ার চূড়ান্ত স্বাধীনতা দেন। আমার গোলের চেয়েও দলের প্রয়োজনটা আগে। আমাদের বিশ্বকাপ তো সেই ২০২২ সালের হারের পর থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে।’
বিশ্বকাপের মঞ্চে এখন মিলিয়ন ডেটা নিমেষে বিশ্লেষণ করছে ‘ফুটবল এআই প্রো’ নামক আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। কিন্তু মেটলাইফের ওই সবুজ গালিচায় হেক্সা-মিশনের ভাগ্য নির্ধারণ করবে প্রযুক্তি, ইউরোপীয় মগজ আর লাতিন আবেগের এক আশ্চর্য ত্রিভুজ। স্মার্ট ভেস্টের নিখুঁত বিজ্ঞান আনসেলোত্তির ছককে নিঁখুত করবে ঠিকই, কিন্তু আমেরিকার বুকে শেষ হাসিটা তোলা থাকবে ওই আনসেলোত্তি-ভিনিসিয়াস ম্যাজিক আর ফুটবলীয় বুদ্ধির জন্যই।
