ফালাকাটা: রাজ্যের প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষায় পড়া ও লেখার দক্ষতা নিশ্চিত করতে স্কুলশিক্ষা দপ্তর এবার কড়া অবস্থান নিল। রাজ্যের সমস্ত প্রাথমিক স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির পড়ুয়াদের ভাষাগত দক্ষতার অডিট করা হবে বলে রবিবার ফালাকাটায় (Falakata) এক অনুষ্ঠানে স্কুল শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন (Dipak Barman) ঘোষণা করেন। উদ্দেশ্য, প্রতিটি পড়ুয়া যেন নিজের মাতৃভাষা সঠিকভাবে পড়তে ও লিখতে পারে। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকদের নিজ জেলায় পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট নীতিমালা আনা হচ্ছে বলেও একইসঙ্গে তিনি জানান। পাশাপাশি এসএসসি (SSC) নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা এবং নতুন নিয়োগ শুরুর বিষয়েও তিনি আশ্বাস দেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘রাজ্যের সমস্ত প্রাথমিক স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির পড়ুয়াদের ভাষাগত দক্ষতার অডিট করা হবে। সেই অডিটে যদি দেখা যায়, কোনও পড়ুয়া মাতৃভাষা ঠিকমতো পড়তে বা লিখতে পারছে না, তাহলে সংশ্লিষ্ট স্কুলের শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান থাকবে।’ অন্যদিকে, যে স্কুল অডিটে ভালো ফল করবে, তাদের পুরস্কৃত করা হবে বলেও তিনি জানান।
শিক্ষামন্ত্রীর এই ঘোষণার পর থেকেই প্রাথমিক শিক্ষকদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও অধিকাংশ শিক্ষকই মনে করছেন, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান আরও উন্নত করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের মতে, কেন্দ্রীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষায় মাতৃভাষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতির আলোচনার সময়ও রাজ্য সরকার বারবার জানিয়েছে, শিশুর প্রাথমিক শিক্ষার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম তার মাতৃভাষা। সেই নীতির ভিত্তিতেই বাংলা সহ বিভিন্ন মাতৃভাষায় পাঠদান, ভাষা শেখার উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলা এবং প্রাথমিক স্তরে মৌলিক সাক্ষরতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা দপ্তরের একাংশের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দেখা গিয়েছে, অনেক পড়ুয়াই উঁচু ক্লাসে উঠে গেলেও মাতৃভাষায় সাবলীলভাবে পড়তে বা লিখতে পারছে না। এর প্রভাব অন্যান্য বিষয় শেখার ক্ষেত্রেও পড়ছে। সেই কারণেই তৃতীয় শ্রেণিকেই মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা দপ্তরের আশা, এই অডিটের মাধ্যমে প্রতিটি স্কুলে ভাষা শিক্ষার প্রকৃত ছবি উঠে আসবে। একইসঙ্গে যেসব স্কুল বা এলাকায় দুর্বলতা ধরা পড়বে, সেখানে অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ, বিশেষ পাঠদান এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহের পরিকল্পনাও নেওয়া হতে পারে বলে শিক্ষা দপ্তর সূত্রে খবর।
অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসংঘ (বিদ্যালয় শিক্ষা)-এর আলিপুরদুয়ার জেলা যুগ্ম সম্পাদক সুমন্ত সিংহ বলেন, ‘ন্যাশনাল এডুকেশন পলিসি–২০২০ অনুযায়ী আমাদের রাজ্যেও সুন্দর ব্যবস্থাপনা চালু হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে তৃতীয় শ্রেণির পড়ুয়াদের লেখা ও পড়ার দক্ষতা যাচাই করা হবে। আমরা সংগঠনগতভাবে শিক্ষা দপ্তরের এমন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই।’ অন্যদিকে, নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সংগঠনের জেলা সম্পাদক প্রসেনজিৎ রায় বলেন, ‘সরকারি স্কুলে অধিকাংশই গরিব, নিম্নবিত্ত, আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা এমনকি প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থীও আসে। তাদের পঠন ও লিখন সামর্থ্য কেবলমাত্র শিক্ষকদের ওপর নির্ভর করে না। শিক্ষকরা তঁাদের সামর্থ্য মাথায় রেখেই পড়ান, ব্যতিক্রম কিছু নেই তা নয়। তাই শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ওপরে সম্পূর্ণ দায় চাপানোর আগে পঠন ও লিখনে অদক্ষতার কারণ খতিয়ে দেখা হবে বলে আশা রাখব।’
এদিন ফালাকাটায় অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসংঘ (বিদ্যালয় শিক্ষা)-এর সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী সারপ্লাস ট্রান্সফার প্রসঙ্গেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন। তিনি জানান, সারপ্লাস নির্ধারণের ক্ষেত্রে সিনিয়ারিটিকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হবে। কোনও সিনিয়ার শিক্ষক সারপ্লাস হিসেবে যেতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের বয়সে সবচেয়ে নবীন শিক্ষককে সারপ্লাস হিসেবে বিবেচনা করা হবে। শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ‘রাজ্যের বিভিন্ন দূরবর্তী জেলায় কর্মরত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ক্ষেত্রে তাঁদের নিজ জেলায় শূন্যপদ থাকলে বদলির বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হবে।’ বিবাহজনিত কারণে নিজ বাড়ি থেকে বহু দূরে কর্মরত পার্শ্বশিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও বাড়ির নিকটবর্তী এলাকায় স্থানান্তরের বিষয়ে শিক্ষা দপ্তর ভাবনাচিন্তা করছে বলেও তিনি জানান।
এদিন ২৬ হাজার শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত মামলার প্রসঙ্গও শিক্ষামন্ত্রী তোলেন। তাঁর কথায়, ‘এসএসসি নিয়োগ প্রক্রিয়া যাতে দ্রুত সম্পূর্ণ করা যায়, সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।’ শুধু তাই নয়, বর্তমান নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর নতুন করে এসএসসি’র নিয়োগ প্রক্রিয়াও শুরু করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

