সাগর বাগচী ও প্রিয়দর্শিনী বিশ্বাস, শিলিগুড়ি: কলকাতায় বৃষ্টি হয়েছে বলে রাজ্যজুড়ে স্কুল ছুটি দিয়ে (Faculty Vacation) দেওয়ার কোনও মানে হয়? শিলিগুড়ি বা উত্তরবঙ্গে তো সেভাবে বৃষ্টি হয়নি। তাহলে ছুটি কেন? জ্যোৎস্নাময়ী গার্লস হাইস্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে মঙ্গলবার বিকালে স্কুল ছুটির আগে অভিভাবকদের কথাবার্তায় বারবার এই প্রশ্নগুলোই উঠে আসছিল।
মালদা (Malda) জেলার ভূতনি, বৈষ্ণবনগরে বন্যা পরিস্থিতির জেরে সেখানকার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের চরম দুর্ভোগে মুখে পড়তে হয়েছিল। ক্ষোভের সুরে অভিভাবকরা নিজেদের মধ্যে প্রশ্ন তোলেন, তাহলে কেন তখন রাজ্য সরকার সেই পড়ুয়াদের দিকে ফিরে তাকাল না? রাজ্যের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন বিরোধী শিক্ষক সংগঠন।
দক্ষিণবঙ্গে গরম পড়লে উত্তরবঙ্গের পড়ুয়াদের ওপর গরমের ছুটি চাপিয়ে দেওয়া হয়। এনিয়ে উত্তরবঙ্গের শিক্ষা মহলে ক্ষোভের শেষ নেই। আবার যেন সেই ছুটিই চাপিয়ে দেওয়ার পুনরাবৃত্তি দেখল গোটা রাজ্য।
শিলিগুড়ির (Siliguri) মিলনপল্লির বাসিন্দা সুস্মিতা ঘোষের মেয়ে জ্যোৎস্নাময়ী গার্লস হাইস্কুলে পড়ে। সুস্মিতার কথায়, ‘রাজ্য সরকার যা ইচ্ছে তাই করছে। প্রতিবাদ করার কেউ নেই। পুজোর আগে তো কয়েকটা দিন স্কুল হতে পারত। পুজোর ছুটি শেষ হলেই তো আবার পরীক্ষা। ক্লাস ঠিকঠাক না হওয়ার কারণে তখন ছাত্রছাত্রীরা সমস্যায় পড়বে।’
সোমবার উচ্চমাধ্যমিকের সিমেস্টার পদ্ধতিতে পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন বিদ্যালয়ে এদিন থেকে ক্লাস শুরু হয়েছে। হাকিমপাড়া বালিকা বিদ্যালয়ের সামনে মেয়ে সোনিয়াকে নিতে এসেছিলেন অভিভাবক মৌসুমি কুণ্ডু। এদিন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্কুল ছুটি দিয়ে দেওয়ার খবরটি তাঁর আগে জানা ছিল না।
খবর শুনেই মৌসুমি রেগে গেলেন। তিনি বললেন, ‘কলকাতায় ছুটি দিক, এখানে তো দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। এখানে তো তেমন বৃষ্টিও হয়নি আর জলও জমেনি। গরমের ছুটির সময়ও দেখেছি কলকাতায় গরম পড়লে এখানেও ছুটি দিয়ে দেয়। আর যখন সত্যিই এখানে গরম পড়ে তখন আমাদের ছেলেমেয়েরা রোদে পুড়ে স্কুলে যায়। এটা তো ঠিক নয়। দুই বঙ্গের আবহাওয়ায় ঢের পার্থক্য।’
ওই স্কুলের সামনে থাকা আরও এক অভিভাবক অশোক সরকার বলেন, ‘এমনিতেই অনেক সময় শুনতে পাই ক্লাস ঠিকঠাক হচ্ছে না। তার ওপর ছুটি এভাবে এগিয়ে দিল। পুজোর আগে ছেলেমেয়েরা এমনিই স্কুলে যেতে চায় না। জোর করে পাঠাই যাতে পুজোর আগে পড়াশোনাটা করে রাখে। কিন্তু অপ্রয়োজনীয়ভাবে ছুটি দেওয়া হল।’
সরকারি ছুটির নির্দেশিকা নিয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা কেউই সেভাবে মন্তব্য করতে চাননি। শিলিগুড়ি বিবেকানন্দ বিদ্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক মহীতোষ দাস বলেন, ‘সরকারি যে নির্দেশিকা রয়েছে সেটাই পালন করা হবে।’
তবে বিরোধী শিক্ষক সংগঠনগুলি রাজ্যের ছুটির নির্দেশিকায় ক্ষোভ উগরে দিয়েছে। শিলিগুড়ি সাংগঠনিক জেলা বিজেপির শিক্ষা সেলের আহ্বায়ক বিশ্বদীপ ঘোষ বলেন, ‘কলকাতায় বৃষ্টি, তাই সেখানের অবস্থা বিচার করে স্থানীয় স্তরে ছুটি ঘোষণা করাই যেত। তাই বলে গোটা রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ক্ষতির মুখে ফেলে ছুটি ঘোষণা করা কখনোই যুক্তিযুক্ত নয়।’
এবিটিএ’র দার্জিলিং জেলা সম্পাদক বিদ্যুৎ রাজগুরুর কথায়, ‘বিদ্যালয়গুলি এখন ছুটির স্কুলে পরিণত হয়েছে। পুজোর ছুটির আগে স্কুলগুলিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকে। উত্তরবঙ্গে যখন প্রচণ্ড গরম পড়ছে বা বন্যা হচ্ছে, পড়ুয়ারা সমস্যায় পড়ছে, সেদিকে কেউ তাকিয়ে দেখে না।’
যদিও রাজ্যের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে তৃণমূল। পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল মাধ্যমিক শিক্ষক সংগঠনের দার্জিলিং জেলার সভাপতি সুপ্রকাশ রায় বলেন, ‘আবহাওয়া দপ্তরের সতর্কতা থেকে রাজ্য ছুটির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কলকাতায় ভয়ংকর বৃষ্টি হয়েছে। রাজ্যজুড়ে বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। পার্বত্য এলাকায় বৃষ্টি হচ্ছে। তাই রাজ্যের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই।’
